ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা,৩০ আগস্ট,২০২৬।বর্ষণমুখর শ্রাবণের এক স্নিগ্ধ সকালে রাধাকুণ্ডের শান্ত ঘাটে বসে ছিলেন এক বৃদ্ধ। তার নাম হরিদাস। তার চোখে শত বছরের স্মৃতি আর হৃদয়ে অপার বৈরাগ্য। চারপাশে ভেজা মাটির সোঁদা গন্ধ আর পাতার ওপর টুপটাপ বৃষ্টির শব্দ এক পবিত্র আবহ তৈরি করেছে। তার সামনে বসে আছে এক তরুণ, নাম মাধব। তার মনে অনেক প্রশ্ন, যার উত্তর খুঁজতে সে এসেছে এই পুণ্যস্থানে।
মাধব জিজ্ঞেস করল, “গুরুদেব, শুনেছি রাধারানী হলেন কৃষ্ণের আদিশক্তি, পরমাত্মা। তিনি ‘দিব্য মাতা ‘, পরমদেবী ও ‘বিশুদ্ধ চেতনাশক্তি ‘৷ কিন্তু আমাদের মতো সাধারণ মানুষের কাছে তার এই মহত্ত্ব কী করে বোঝা সম্ভব?”
হরিদাস মৃদু হাসলেন। তার দৃষ্টি চলে গেল রাধাকুণ্ডের শান্ত জলের দিকে। তিনি বলতে শুরু করলেন, “শোনো মাধব, রাধারানীর মহিমা বোঝার জন্য শুধু শাস্ত্র পাঠ যথেষ্ট নয়, হৃদয়ের শুদ্ধি প্রয়োজন। রাধা হলেন সেই প্রেম, যা কোনো স্বার্থের বন্ধনে আবদ্ধ নয়। এই যে রাধাকুণ্ড দেখছ, এর পেছনেও এক অপার প্রেমের গল্প লুকিয়ে আছে।”
হরিদাস এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলতে লাগলেন, “একদিন কৃষ্ণ এক বৃষরূপী অসুরকে বধ করলেন। তার সখারা তখন বলল, ‘তুমি তো বৃষরূপী অসুরকে বধ করেছ, তাই তোমাকে পাপ স্পর্শ করেছে। এই পাপ থেকে মুক্তি পেতে তোমাকে সব তীর্থের জলে স্নান করতে হবে।’ কৃষ্ণ তখন মুচকি হাসলেন। তিনি তার পায়ের গোড়ালির চাপে এক বিরাট গর্ত তৈরি করলেন, আর সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সব তীর্থের জল সেই গর্তে এসে জমা হলো। এই কুণ্ডের নাম হলো শ্যামকুণ্ড।”
মাধব অবাক হয়ে শুনছিল। হরিদাস আবার বলতে শুরু করলেন, “সবাই দেখল, কৃষ্ণ নিজ শক্তিতে সব তীর্থের জল নিয়ে এলেন। রাধারানীর মনে তখন এক অভিমান জন্ম নিল। তিনি ভাবলেন, ‘কৃষ্ণ যদি সব তীর্থের জল তৈরি করতে পারেন, তবে আমিও পারি।’ এই ভেবে তিনি তার হাতের চুড়ির আঘাতে আরেকটি গর্ত তৈরি করলেন, কিন্তু তাতে কোনো জল এলো না। তার সখীরা তখন হাসাহাসি শুরু করল।”
“রাধারানী তখন খুব দুঃখ পেলেন। তিনি কেঁদে বললেন, ‘আমার প্রেম যদি সত্যিকারের হয়, তবে সব তীর্থের জল আমার কুণ্ডেও আসবে।’ তার এই পবিত্র কান্নায় সেই গর্ত ভরে গেল। রাধারানীর চোখের জল, অর্থাৎ তার শুদ্ধ প্রেম সেই কুণ্ডের জল। এই কুণ্ড হলো রাধাকুণ্ড। রাধার প্রেম এতটাই পবিত্র ও গভীর ছিল যে কৃষ্ণের সব তীর্থের জলও তার চোখের জলের কাছে পরাজিত হলো। শ্যামকুণ্ড ও রাধাকুণ্ড তাই পাশাপাশি অবস্থান করে, যা কৃষ্ণ ও রাধার অবিচ্ছেদ্য প্রেমের প্রতীক।”
মাধবের চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝল, রাধা শুধু কৃষ্ণের প্রেমিকা নন, তিনি প্রেমেরই এক প্রতিরূপ। হরিদাস বললেন, “রাধারাণীকে শুধু প্রেমিকা হিসেবে দেখলে তার মহিমা বোঝা যায় না। বৈষ্ণব ধর্মে, রাধাকে কৃষ্ণের হ্লাদিনী শক্তি বলা হয়, অর্থাৎ কৃষ্ণের আনন্দদায়িনী শক্তি। কৃষ্ণ আনন্দস্বরূপ, আর রাধা সেই আনন্দের মূর্ত রূপ। রাধা হলেন প্রেমের সর্বোচ্চ প্রকাশ, যাকে ‘মহাভাব’ বলা হয়।”
হরিদাস থামলেন, আর মাধবের দিকে তাকিয়ে বললেন, “মাধব, রাধারানীর প্রতি ভক্তি শুধু ব্রজধামে সীমাবদ্ধ নয়। লোককথায় রাধারানীর অনেক অলৌকিক গল্প প্রচলিত। যেমন, বলা হয় যে রাধা যখন হাঁটেন, তখন তার পায়ের ছাপ থেকে পদ্মফুল ফোটে। এই লৌকিক ধারণাগুলো আসলে রাধার পবিত্রতা ও সৌন্দর্যের প্রতীকী প্রকাশ।”
“তাছাড়া, রাধাষ্টমী উৎসব শুধু তাঁর জন্মতিথি নয়, এটি হলো আমাদের জীবনে প্রেম, করুণা ও ত্যাগের আদর্শকে নতুন করে উপলব্ধি করার দিন। এই দিনে ভক্তরা উপবাস করে, কীর্তন করে, এবং রাধাকৃষ্ণের বিগ্রহকে দুধ, দই ও মধু দিয়ে অভিষেক করায়। এই আচারগুলো শুধু বাহ্যিক নয়, এগুলোর মাধ্যমে ভক্ত তার অন্তরকে শুদ্ধ করে রাধারানীর কৃপা কামনা করে।” রাধাকে না পেলে ভগবান শ্রীকৃষ্ণ মেলে না ৷
হরিদাস আবার বলতে লাগলেন, “এই যে তুমি দেখছ, রাধাকুণ্ডের জল পান করলে বা এতে স্নান করলে নাকি সব পাপ দূর হয়—এটি শুধু একটি বিশ্বাস নয়। এটি আসলে এই বার্তা দেয় যে রাধারানীর প্রেমের স্পর্শে আমাদের হৃদয়ের সব মলিনতা দূর হয়। রাধা হলেন সেই ‘দিব্য মাতা’, যিনি তার ভালোবাসার মাধ্যমে সব জীবকে তার সন্তানের মতো কাছে টেনে নেন।”
“গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে চৈতন্য মহাপ্রভু রাধারানীর ভাব ধারণ করে কৃষ্ণপ্রেমের প্রচার করেছেন। তিনি রাধারানীর বিরহের সেই সর্বোচ্চ রূপ ‘মহাভাব’ প্রকাশ করে দেখিয়েছেন, কীভাবে রাধার প্রেমই একমাত্র পথ যার দ্বারা সবচেয়ে সহজে ঈশ্বরকে পাওয়া যায় । রাধা কোনো সাধারণ নারী নন, তিনি হলেন আমাদের আত্মার প্রতিচ্ছবি, যে আত্মা ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হতে চায়।” ৷ প্রতিটি জীবাত্মা পরমাত্মার কাছে যেতে চায় ৷
মাধব বুঝতে পারল যে রাধারানী শুধু দেবী নন, তিনি প্রেম, করুণা ও আত্মত্যাগের প্রতিমূর্তি। তাঁর প্রেমই মানুষকে ঈশ্বরের সঙ্গে মিলিত হতে সাহায্য করে।তিনি অদ্বিতীয় প্রেমিকা ৷ প্রেম , দ্বন্দ্ব , প্রত্যাশা ও ত্যাগের প্রতীক ৷ তাঁর ছবি সৌন্দর্য , প্রেম ও আবেগের প্রতিমূর্তি ৷ তিনি ভারতীয় সাহিত্যের নায়িকা , চিত্রকলার অনুপ্রেরণা , লোকসুরের অংশ ও দৈনন্দিন উৎসব – উপাসনার অংশ ৷ সেদিন থেকে মাধব শুধু রাধার নাম জপ করেই তার জীবনকে পবিত্র করল। সে বুঝল, রাধারানীকে জানতে হলে তাঁকে অন্তর থেকে ভালোবাসতে হবে, আর তাঁকে ভালোবাসতে হলে জগতের প্রতিটি জীবকে ভালোবাসতে হবে। কারণ, রাধা হলেন প্রেমের সেই আদিশক্তি যা সব জীবকে এক সুতোয় গেঁথে রাখে।
