কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ৬ জুলাই, ২০২৬। ভারতীয় জনসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার বাংলা-সহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা কর্মসূচি, আলোচনা সভা, শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন এবং স্মরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এই বিশেষ দিনে তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ বার্তা পোস্ট প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। সেই বার্তায় তিনি ডঃ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক দর্শন, তাঁর আদর্শ এবং দেশের প্রতি তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করার পাশাপাশি জম্মু-কাশ্মীর থেকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ কার্যত বিলোপের সিদ্ধান্তকেই তাঁর প্রতি “সবচেয়ে উপযুক্ত শ্রদ্ধার্ঘ” বলে উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর পোস্টে লেখেন, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় অন্য ভাবনার রাষ্ট্রনায়ক ! তাঁর সারাজীবন ভারতের ঐক্য, অখণ্ডতা, অগ্রগতি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় উৎসর্গীত। তাঁর সাহস, দৃঢ় নৈতিক অবস্থান, অকৃত্রিম দেশপ্রেম এবং মানুষের জন্য কাজ করার আদর্শ আজও কোটি কোটি ভারতবাসীকে অনুপ্রাণিত করে। মোদীর বক্তব্যে উঠে আসে, ভারতের অবিভক্ত রূপই ছিল ডঃ মুখোপাধ্যায়ের আজীবনের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি দেশের সংবিধান ও প্রশাসনিক কাঠামোতে কোনও ধরনের বিভাজনের বিরোধিতা করেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে স্মরণ করেন, জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদার বিরোধিতাই ধীরে ধীরে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম প্রধান অধ্যায় হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, বহু দশক আগে যে লক্ষ্য এবং যে আদর্শ সামনে রেখে ডঃ মুখোপাধ্যায় আন্দোলন শুরু করেন, ২০১৯ সালে কেন্দ্রীয় সরকারের নেওয়া ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায়। তাই সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ এবং ৩৫(ক) কার্যত বিলোপ করাকেই তিনি ডঃ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি হিসেবে তুলে ধরেন।
মোদী আরও লিখেছেন, ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত থাকে, যখন কোনও মানুষের আত্মত্যাগ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং জাতির স্মৃতির অংশ হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষায়, ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের শেষ যাত্রাও তেমনই এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্তের ফলে ভারতের ঐক্য ও অখণ্ডতা আরও শক্তিশালী হয়েছে এবং জম্মু-কাশ্মীর দেশের মূল স্রোতের সঙ্গে আরও নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে সেখানে উন্নয়ন, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং সাধারণ মানুষের জন্য নাগরিক পরিষেবা আরও বিস্তৃত করার পথও সুগম হয়েছে বলে, তাঁর মত।
ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদার বিরোধিতা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি দেশের মধ্যে আলাদা সংবিধান, আলাদা পতাকা কিংবা আলাদা প্রশাসনিক কাঠামো জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী। সেই বিশ্বাস থেকেই তিনি উচ্চারণ করেন তাঁর বহুল পরিচিত স্লোগান— “এক দেশে দুই বিধান, দুই প্রধান, দুই নিশান চলবে না।” এই স্লোগান পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জনসঙ্ঘ এবং পরে ভারতীয় জনতা পার্টির অন্যতম রাজনৈতিক দর্শনে পরিণত হয়।
১৯৫৩ সালে জম্মু-কাশ্মীরে প্রবেশের সময় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। আটক অবস্থাতেই তাঁর মৃত্যু হয়, যা আজও ভারতীয় রাজনীতির একটি বহুল আলোচিত অধ্যায়। তাঁর মৃত্যুর পরও তাঁর আদর্শ এবং দাবি রাজনৈতিক পরিসরে জীবন্ত থেকেছে। পরবর্তী সময়ে ভারতীয় জনসঙ্ঘ এবং পরে বিজেপি অনুচ্ছেদ ৩৭০ প্রত্যাহারকে তাদের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক অঙ্গীকার হিসেবে তুলে ধরে এবং দীর্ঘদিন ধরে সেই দাবিতে সরব থাকে।
অবশেষে ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট কেন্দ্রীয় সরকার সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩৭০ কার্যত বিলোপের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে। একই সঙ্গে অনুচ্ছেদ ৩৫(ক)-এরও অবসান ঘটে এবং জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা প্রত্যাহার করা হয়। পাশাপাশি তৎকালীন রাজ্যকে পুনর্গঠন করে দুটি পৃথক কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়— জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ। এই সিদ্ধান্ত দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের জন্ম দিলেও বিজেপি শুরু থেকেই একে জাতীয় সংহতি সুদৃঢ় করার একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে তুলে ধরে এসেছে। ১২৫তম জন্মবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বার্তাতেও সেই অবস্থানই স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর বক্তব্যে ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় কেবল একজন রাজনৈতিক নেতা নন, বরং জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ডতার এক প্রতীক, যার আদর্শকে বাস্তব রূপ দেওয়ার দাবিই এদিন আবারও সামনে আনল কেন্দ্র।
আমাদের তরফ থেকেও থাকল, ভারতকেশরী ডক্টর শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের প্রতি অনন্ত শ্রদ্ধা।
