নিজস্ব প্রতিনিধি : কলকাতা, ৫ জুলাই, ২০২৬। শতাব্দী পার করা ঐতিহ্যেবাহী রথযাত্রার পাশে এবার নতুন সরকার। এই সব রথকে আরও জাঁকজমকপূর্ণ করে তোলার সিদ্ধান্ত সরকারের। বাংলার ইতিহাস, সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ১০০ থেকে ১৫০ বছরের পুরনো প্রতিটি ঐতিহ্যশালী রথযাত্রা কমিটিকে ৫ লক্ষ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা নবান্নর। জেলায় জেলায় ছড়িয়ে থাকা এই প্রাচীন রথযাত্রাগুলিকে নতুন করে উৎসাহ ও মর্যাদা দিতেই এই উদ্যোগ বলে প্রশাসনিক সূত্রে জানা যায়। ইতিমধ্যেই রাজ্যের বিভিন্ন জেলার ঐতিহ্যশালী রথযাত্রা কমিটিগুলিকে চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর অনুমোদিত প্রতিনিধিদের হাতে আগামী ১৩ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে অনুদানের চেক তুলে দেওয়া হতে পারে। জানা গিয়েছে, সেই অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ভার্চুয়ালি উপস্থিত থেকে রাজ্যের বিভিন্ন রথযাত্রা কমিটির প্রতিনিধিদের উদ্দেশে বক্তব্যও রাখতে পারেন।
শুধু আর্থিক সহায়তাই নয়, আসন্ন রথযাত্রা উৎসবকে ঘিরে যাতে কোথাও কোনও ধরনের অসুবিধা না হয়, সেদিকেও বিশেষ নজর দিয়েছে রাজ্য সরকার। ইতিমধ্যেই তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের পক্ষ থেকে সমস্ত জেলার জেলাশাসকদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব হল রথযাত্রা। শুধু রাজ্যের বিভিন্ন জেলা থেকেই নয়, দেশের নানা প্রান্ত থেকেও অসংখ্য ভক্ত এই উৎসবে যোগ দিতে আসেন। তাই তাঁদের নিরাপত্তা, স্বাচ্ছন্দ্য এবং প্রয়োজনীয় পরিষেবা নিশ্চিত করতে প্রশাসনকে আগে থেকেই সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিতে হবে।
এই লক্ষ্যেই জেলা প্রশাসনকে সংশ্লিষ্ট সমস্ত দপ্তর ও অংশীদারদের সঙ্গে সমন্বয় রেখে রথযাত্রার নির্ধারিত রুট এবং ভক্তদের জমায়েতের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলিতে সেবা শিবির গড়ে তোলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। শুধু রথযাত্রার দিনই নয়, উল্টোরথের দিনও এই সেবা শিবির চালু রাখতে হবে। প্রতিটি জেলার জন্য এই সেবা শিবির পরিচালনার উদ্দেশ্যে ১ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে।
সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, প্রতিটি সেবা শিবিরে ন্যূনতম কয়েকটি অত্যাবশ্যকীয় পরিষেবা রাখতে হবে। তার মধ্যে রয়েছে বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, ওআরএস প্যাকেট, প্রাথমিক চিকিৎসা ও জরুরি স্বাস্থ্য পরিষেবা, তথ্য ও সহায়তা কেন্দ্র, প্রবীণ নাগরিক, মহিলা, শিশু এবং বিশেষভাবে সক্ষম ভক্তদের জন্য বিশেষ সহায়তা। পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী আরও অন্যান্য ভক্তবান্ধব পরিষেবাও চালু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, যাতে উৎসবে অংশ নিতে আসা মানুষের কোনও ধরনের সমস্যার মুখে পড়তে না হয়।
সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। যদি কোনও জেলার প্রশাসনের মনে হয়, কোনও বিশেষ রথযাত্রা কমিটি তার ঐতিহাসিক গুরুত্ব, বিপুল জনসমাগম অথবা উৎসবের ব্যাপকতার কারণে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তার যোগ্য, তাহলে সেই কমিটির বিষয়ে বিস্তারিত কারণ উল্লেখ করে সরকারের কাছে সুপারিশ পাঠানো যাবে। অর্থাৎ প্রয়োজন অনুযায়ী অতিরিক্ত অনুদানের পথও খোলা রাখা হয়েছে।
উৎসবকে কেন্দ্র করে আইন-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা এবং জনসেবার বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সেই কারণে রথযাত্রার আগে জেলা প্রশাসনকে পুলিশ, স্বাস্থ্য দপ্তর, দমকল, পূর্ত দপ্তর, পুরসভা ও পঞ্চায়েত, পরিবহণ দপ্তর, সংশ্লিষ্ট রথযাত্রা কমিটি, জনপ্রতিনিধি এবং অন্যান্য দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় বৈঠক করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই বৈঠকে ভিড় নিয়ন্ত্রণ, যান চলাচল স্বাভাবিক রাখা, নিরাপত্তা জোরদার করা এবং জরুরি পরিষেবা নিশ্চিত করার বিষয়গুলি অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে পরিকল্পনা করতে বলা হয়েছে।
নবান্ন সূত্রে আরও জানা যায়, রথযাত্রার রুট এবং বিভিন্ন সেবা শিবিরে সরকারের নেওয়া জনকল্যাণমূলক উদ্যোগগুলির প্রচার নির্ধারিত নির্দেশিকা মেনেই করতে হবে। একই সঙ্গে সাধারণ মানুষ যাতে সহজেই জানতে পারেন সেবা শিবিরে কী কী সুবিধা পাওয়া যাবে, তার জন্যও পর্যাপ্ত প্রচারের ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
উৎসব শেষ হওয়ার পরেও প্রশাসনিক দায়িত্ব শেষ হচ্ছে না। প্রতিটি জেলা প্রশাসনকে গৃহীত সমস্ত ব্যবস্থা, বরাদ্দ অর্থ কীভাবে ব্যবহার করা হল, কর্মসূচির আলোকচিত্র এবং একটি সংক্ষিপ্ত রিপোর্ট দ্রুত তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরে জমা দিতে হবে। সরকারি বিজ্ঞপ্তিতে এই গোটা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শতাব্দীপ্রাচীন রথযাত্রার চাকা প্রতি বছর নতুন আশার বার্তা আনে, এবার সেই ঐতিহ্যের পথকে আরও সুদৃঢ় করতে আর্থিক সহায়তা, উন্নত জনপরিষেবা এবং সুপরিকল্পিত প্রশাসনিক প্রস্তুতির মাধ্যমে এক নতুন দৃষ্টান্ত রাজ্য সরকারের। ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং মানুষের উৎসবকে আরও নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সাড়ম্বরে উদযাপনের লক্ষ্যেই নবান্নের এই উদ্যোগকে তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে প্রশাসনিক মহল।
