কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১৫ জুলাই, ২০২৬। মনে পড়ছে লাহোর জেলে অনশনরত শহীদ যতীন দাসের কথা। সারা দেশের নজর সেদিন ছিল লাহোর জেলের দিকে আর আজ দিল্লির যন্তর মন্তরে ! নিট-সহ একাধিক সর্বভারতীয় পরীক্ষায় কারচুপির অভিযোগে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে টানা ১৮ দিন ধরে অনশনে শিক্ষাবিদ ও পরিবেশপ্রেমী সোনম ওয়াংচুক। দিল্লির যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির মঞ্চ থেকে শুরু হওয়া এই অনির্দিষ্টকালের অনশন দীর্ঘ হচ্ছে, বাড়ছে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়েও উদ্বেগ। দীর্ঘদিন উপবাসে থাকায় শারীরিক অবস্থার অবনতি স্বাভাবিক। ফলে আন্দোলনের দাবিদাওয়ার পাশাপাশি এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু সোনম ওয়াংচুকের সুস্থতা। দেশজুড়ে বহু মানুষ তাঁর পাশে, একের পর এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বও তাঁর প্রতি সংহতি জানিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন।
সাম্প্রতিক সময়ে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থা নিয়ে মুখ খুলেছেন বলিউড অভিনেতা ওমি বৈদ্য। জনপ্রিয় ছবি ‘থ্রি ইডিয়টস’-এর ‘সাইলেন্সার’ বা ‘চতুর রামালিঙ্গম’ তিনি। তিনি প্রকাশ্যে সোনম ওয়াংচুকের সুস্থতা কামনা করেছেন একই সঙ্গে তাঁর আন্দোলনের প্রতি সমর্থনও। তবে শুধু ওমি বৈদ্য নন, চলচ্চিত্র জগতের আরও অনেকেই সমাজমাধ্যমে সোনমের পাশে দাঁড়িয়েছেন। হয়ত বিভিন্ন কারণে সকলের পক্ষে দিল্লির যন্তর মন্তরে পৌঁছনো সম্ভব নয়, তবুও সামাজিক মাধ্যমে তাঁরা নিজেদের সংহতির বার্তা পৌঁছে দিচ্ছেন।
ইতিমধ্যেই অনশন মঞ্চে সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে দেখা করেন বলিউড অভিনেত্রী স্বরা ভাস্কর। তাঁর এই সফরে আন্দোলনকারীদের মনোবল আরও তুঙ্গে। ককরোচ জনতা পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে সেই সাক্ষাতের বিশেষ কিছু ছবি ইতিমধ্যেই প্রকাশিত। পাশাপাশি স্বরা নিজেও নিজের ইনস্টাগ্রাম স্টোরিতে একাধিক ছবি শেয়ার করেছেন। সেই ছবিগুলির মধ্যে একটি ছিল ককরোচ জনতা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে করমর্দনের। সেই ছবির সঙ্গে তিনি লিখেছেন, “সকল সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য যে লড়াই করছেন, তার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।” এই বার্তার মাধ্যমে তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, এই আন্দোলন শুধুমাত্র একটি রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মসূচি নয়, আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যতের লড়াই।
আরও একটি ছবিতে দেখা যায়, সোনম ওয়াংচুকের সঙ্গে কথা বলছেন স্বরা ভাস্কর। সেই ছবি শেয়ার করে অভিনেত্রী তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও সংহতির কথা প্রকাশ করেন। তিনি লেখেন, “আপনি অপ্রতিরোধ্য, অদম্য সোনম ওয়াংচুক স্যার। আপনি আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য লড়াই করছেন। আপনার প্রতি পূর্ণ সংহতি ও কৃতজ্ঞতা।” স্বরার এই বার্তা খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সমাজমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বহু মানুষ তা সমর্থন করেন। অনেকেই মনে করছেন, সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন কেবল একটি পরীক্ষার প্রশ্নফাঁসের প্রতিবাদ নয়, দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার রক্ষার লড়াই।
সোনম ওয়াংচুকের এই দীর্ঘ অনশন এবং ককরোচ জনতা পার্টির আন্দোলন নিয়ে ইতিমধ্যেই দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। জিনাত আমন, সোনি রাজদান, নাসিরুদ্দিন শাহ, রত্না পাঠক-সহ বহু বিশিষ্টজন অনশনরত আন্দোলনকারীদের সমর্থনকারী। তবে একইসঙ্গে তাঁরা সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা মাথায় রেখে অনশন প্রত্যাহারেরও আবেদন জানান। তাঁদের মতে, এই আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা আছে, একই সঙ্গে আন্দোলনের অন্যতম মুখের জীবনও সমান মূল্যবান।
বিশেষ করে জিনাত আমন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দ্রুত আলোচনায় বসার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, পরিস্থিতি আর দীর্ঘায়িত না করে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথ খুঁজে বের করা উচিত। অন্যদিকে সোনি রাজদানও সমাজমাধ্যমে সোনম ওয়াংচুককে উদ্দেশ্য করে লিখেছেন, তিনি যেন অনশন প্রত্যাহার করে সুস্থ হয়ে ওঠেন। কারণ আগামী দিনের লড়াই চালিয়ে যেতে তাঁর সুস্থ থাকা সবচেয়ে বেশি জরুরী। আন্দোলনের উদ্দেশ্য সফল করতে হলে দীর্ঘ পথ পেরোতে হবে, আর সেই পথ চলার জন্য সোনম ওয়াংচুকের সুস্থতা অত্যন্ত জরুরি বলেই তাঁর ধারণা।
এদিকে সোনম ওয়াংচুকের শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নীরবতা নিয়ে উদ্বেগ সাধারণ মানুষেরও। তাঁদের মতে, এত দীর্ঘ সময় ধরে অনশন চললেও এখনও পর্যন্ত সমস্যার সমাধানে কার্যকর উদ্যোগের অভাব চোখে পড়ছে। যন্তর মন্তরের অনশন মঞ্চে প্রতিটি দিন এখন একটি কঠিন পরীক্ষার নাম। একদিকে অনড় দাবি, অন্যদিকে ক্রমশ ভেঙ্গে পড়া শরীর এই দুইয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সোনম ওয়াংচুক নীরব অথচ দৃঢ় সংকল্পের এক প্রতীক। তাঁর অনশন এখন শুধু একটি আন্দোলনের কর্মসূচি নয়, বরং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকার এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের এক গভীর প্রতীক হয়ে উঠেছে। আর সেই কারণেই তাঁর সুস্থতা নিয়ে উদ্বেগ যেমন বাড়ছে, তেমনই বাড়ছে দ্রুত সমাধানের দাবিও।
কেন্দ্রীয় সরকার কি নরম হবে ? বসবে আলোচনায় ?
