মুখ্যমন্ত্রীরও মহানায়ক উত্তমকুমার…।

মুখ্যমন্ত্রীরও মহানায়ক তিনি !

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ১৩ জুলাই, ২০২৬। তিনি নিজেই ইতিহাস ! সময়কে অতিক্রম করেও চিরকালীন ! তিনি মহানায়ক উত্তম কুমার। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় অভিনেতা নন, তিনি বাঙ্গালীর আবেগ, ভালোবাসা, রুচি ও সংস্কৃতির এক অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ! তাঁর হাসি, চোখের ভাষা, সংলাপ বলার ভঙ্গি, পরিমিত অভিনয়, ব্যক্তিত্ব এবং অনবদ্য উপস্থিতি আজও বাংলা চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে এক অমলিন স্মৃতি ! সময় বদলেছে, নতুন প্রজন্মে বাংলা সিনেমায় অসংখ্য অভিনেতার আগমন, কিন্তু তাঁর বিকল্প কি আজও তৈরি হয়েছে ? আজও তিনি বাঙ্গালীর এক এবং অদ্বিতীয় ম্যাটিনি আইডল !
জীবিত থাকলে চলতি বছরেই শতবর্ষে পা দিতেন। তাঁর প্রয়াণের পর সাড়ে চার দশক কেটে গিয়েছে, কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তা এতটুকু কমেনি ! সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি কিংবদন্তি আজ ! তাঁর জন্মশতবর্ষকে স্মরণীয় করে রাখতে এবার বিশেষ উদ্যোগ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ! মহানায়কের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে সারা বছর জুড়ে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা ! সেই উদ্যোগের অংশ হিসেবেই সোমবার অভিনেতা প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়ের কাছে একটি বিশেষ চিঠি পাঠিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী !
কিছুদিন আগেই নবান্নে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়। সেই সাক্ষাৎকে ঘিরে রাজনৈতিক মহলের একাংশ নানা জল্পনা শুরু করলেও বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রসেনজিৎ স্পষ্ট জানান, তাঁদের আলোচনার মূল বিষয় ছিল বাংলা চলচ্চিত্র শিল্পের উন্নয়ন এবং ইন্ডাস্ট্রির সার্বিক স্বার্থ। কোনও রাজনৈতিক আলোচনা নয়, বরং সিনেমা ও শিল্পীদের ভবিষ্যৎ নিয়েই বিস্তারিত কথা হয়েছে তাঁদের !
সাংবাদিকদের তখনই প্রসেনজিৎ ইঙ্গিত দেন, মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে রাজ্য সরকারের তরফে বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে ! এবার সেই ঘোষণার আরও স্পষ্ট রূপ মুখ্যমন্ত্রীর পাঠানো চিঠিতে !
চিঠিতে শুভেন্দু অধিকারী লিখেছেন, বাংলা সিনেমার গৌরবময় ঐতিহ্যকে সম্মান জানাতে গিয়ে এ বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল মহানায়ক উত্তম কুমারের ১০০ তম জন্মজয়ন্তী। তিনি উল্লেখ করেছেন, বাঙ্গালীর মনন, শিল্পচেতনা এবং বাংলা চলচ্চিত্রে উত্তম কুমারের অবদান চিরভাস্বর ও অদ্বিতীয় ! সেই কারণেই পশ্চিমবঙ্গ সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সকলকে সঙ্গে নিয়ে অত্যন্ত বৃহৎ, মর্যাদাপূর্ণ ও বর্ণাঢ্য আয়োজনে এই জন্মশতবর্ষ উদযাপন করা হবে !
শুধু সরকারি অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ না থেকে, বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সকল শিল্পী, কলাকুশলী, পরিচালক, প্রযোজক, টেকনিশিয়ান এবং সংশ্লিষ্ট সকলকে এই উদ্যোগে সামিল হওয়ারও আবেদন মুখ্যমন্ত্রীর। তাঁর বক্তব্য, মহানায়কের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধাঞ্জলি তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন গোটা বাংলা চলচ্চিত্র জগত একসঙ্গে এই উদযাপনের অংশীদার হবে।
চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “এই মহৎ উদ্যোগকে সফল করে তুলতে সমগ্র বাংলা চলচ্চিত্র জগতের শিল্পী, কলাকুশলী ও সংশ্লিষ্ট সকলের সক্রিয় ভূমিকা একান্তভাবে কাম্য। আপনাদের সহযোগিতা ও সম্মিলিত অংশগ্রহণেই মহানায়কের প্রতি সমগ্র বাংলা চলচ্চিত্র জগতের শ্রদ্ধাঞ্জলি প্রকৃত অর্থে পূর্ণতা লাভ করবে।”
প্রসঙ্গত, রবিবার ওয়েস্ট বেঙ্গল মোশন পিকচার্স আর্টিস্ট ফোরামের উদ্যোগে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি ২০২৬’ শীর্ষক এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। সেখানে বাংলা চলচ্চিত্রের বহু প্রবীণ শিল্পী সংবর্ধিত হন। সম্মানিতদের তালিকায় ছিলেন মাধবী মুখোপাধ্যায়, লিলি চক্রবর্তী, অলকা গঙ্গোপাধ্যায়, মিতা চট্টোপাধ্যায়, ধীমান চক্রবর্তী, সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়, নিমাই ঘোষ, বিপ্লব চট্টোপাধ্যায়, দীপঙ্কর দে এবং অলকানন্দা রায় বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ আরও বহু বর্ষীয়ান শিল্পী। দীর্ঘদিন ধরে বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁদের অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবেই এই সম্মান প্রদান করা হয়।
মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে এই অনুষ্ঠান সফলভাবে আয়োজন করার জন্যও প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়কে শুভেচ্ছা জানান। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন, মহানায়ক উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ উদযাপনও একইভাবে বাংলা চলচ্চিত্র জগতের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
উত্তম কুমার শুধু একজন অভিনেতার নাম নয়, তিনি একটি যুগের নাম। তিনি বাংলা সিনেমাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন। তাঁর অভিনয়, ব্যক্তিত্ব, সৌন্দর্যবোধ এবং দর্শকের সঙ্গে অদৃশ্য এক আবেগের বন্ধন আজও অটুট। তাই তাঁর জন্মের একশো বছর পূর্তিতে রাজ্য সরকারের এই উদ্যোগ শুধু একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপন নয়, বরং বাংলা চলচ্চিত্রের গৌরবময় ইতিহাসকে নতুন প্রজন্মের সামনে আরও মর্যাদার সঙ্গে তুলে ধরার এক আন্তরিক প্রয়াস। মহানায়কের প্রতি এই শ্রদ্ধা নিঃসন্দেহে বাংলা সিনেমার ইতিহাসে এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।
মহানায়কের জন্মশতবর্ষ ধুমধাম করে পালনে উদ্যোগী হওয়ার জন্য, আমাদের তরফ থেকে মুখ্যমন্ত্রীকে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। একটা প্রশ্ন মনের ভেতর উঁকিঝুঁকি মারছে ! ভোটের আগে শোনা গিয়েছিল, এরা জিতলে বাংলার সংস্কৃতি নাকি ধ্বংস হবে ! অবশ্য সবে দু মাস পার হয়েছে নতুন সরকারের। তবু এখনও পর্যন্ত নতুন সরকার বা মুখ্যমন্ত্রী কোথাও কি বাংলার সংস্কৃতি ধ্বংসের চেষ্টা করেছেন ? একটা ইংরেজি প্রবাদ মনে পড়ছে, ‘মর্নিং শোজ দা ডে’ !

 

More From Author

হিন্দু ধর্মে মুনি, ঋষি, সাধু, সন্ন্যাসী ও যোগী: বিস্তারিত তুলনামূলক আলোচনা এবং মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা…।

১৮ দিন টানা সোনমের অনশন, শিক্ষামন্ত্রী কি দেখা করবেন… ?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *