ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷
একশো বছর আগে
একটি নাম এসেছিল পৃথিবীতে—
অরুণকুমার চট্টোপাধ্যায়;
কেউ তখন জানত না,
এই ছেলেটিই একদিন
বাঙালির স্বপ্নের পর্দায়
হয়ে উঠবে—
উত্তমকুমার, মহানায়ক।
১৯২৬-এর সেপ্টেম্বরের তিন,
একটি শিশুর জন্ম নয় শুধু,
জন্ম নিয়েছিল যেন
এক ভবিষ্যৎ চলচ্চিত্র-পুরাণ।
পথটা কিন্তু সহজ ছিল না—
আলোয় ওঠার আগে
ছিল অন্ধকার,
ছিল ব্যর্থতার পর ব্যর্থতা,
ছিল নিজেকে প্রমাণ করার
অদম্য জেদ।
১৯৪৮-এ সিনেমায় প্রথম পা,
তারপর কত নাম, কত ছবি,
কত না-পাওয়া, কত অপেক্ষা—
শেষ পর্যন্ত
বাংলা পর্দা চিনল
একটি নতুন উচ্চারণ—
উত্তম।
তারপর
বাঙালির ঘরে ঘরে
এক আশ্চর্য পরিবর্তন।
সিনেমা আর শুধু সিনেমা রইল না,
হল প্রেমের ভাষা,
অভিমানের ব্যাকরণ,
স্বপ্ন দেখার জানালা।
আর সেই জানালায়
সুচিত্রা সেন এসে দাঁড়ালেন।
দুটি মুখ—
দুটি চোখ—
দুটি মানুষ নয় যেন,
বাঙালির কল্পনায়
একটি সম্পূর্ণ প্রেমকাহিনি।
‘অগ্নিপরীক্ষা’, ‘শাপমোচন’,
‘হারানো সুর’, ‘সপ্তপদী’,
‘সাগরিকা’, ‘চাওয়া-পাওয়া’—
কত নাম বলব!
তাঁদের পর্দার প্রেমে
কত প্রজন্ম প্রেম শিখেছে,
কত চিঠি লেখা হয়েছে,
কত গান গোপনে গাওয়া হয়েছে,
কত মনের ভিতর
নিঃশব্দে তৈরি হয়েছে
নিজস্ব এক ‘উত্তম-সুচিত্রা’ পৃথিবী।
কিন্তু উত্তম
শুধু সুচিত্রার নায়ক নন।
সাবিত্রী চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে
হাসির দরজা খুলে যায়—
‘মৌচাক’, ‘ধন্যি মেয়ে’, ‘দুই ভাই’,
‘ভ্রান্তিবিলাস’—
সেখানে তিনি কখনও
দুষ্টু, কখনও সরল,
কখনও একেবারে
পাড়ার পরিচিত মানুষ।
সুপ্রিয়া দেবীর পাশে
অন্য এক উত্তম—
আরও পরিণত, আরও গভীর,
‘সোনার হরিণ’, ‘উত্তরায়ণ’,
‘কাল তুমি আলেয়া’, ‘সন্ন্যাসী রাজা’—
পর্দায় জন্ম নেয়
সম্পর্কের অন্য ভাষা।
অপর্ণা সেনের সঙ্গে
সময়ের বদলে যাওয়া মুখ—
‘অপরিচিত’, ‘মেমসাহেব’,
আরও কত ছবির স্মৃতি;
মাধবী মুখোপাধ্যায়,
মালা সিনহা, তনুজা,
সন্ধ্যা রায়, কাবেরী বসু—
প্রতিটি সহ-অভিনেত্রীর পাশে
উত্তম যেন
নিজের অভিনয়ের আরেকটি দরজা খুলেছেন।
আর তারপর—
শর্মিলা ঠাকুর।
একটি ট্রেন ছুটছে
কলকাতা থেকে দিল্লির পথে।
জানলার বাইরে
পিছিয়ে যাচ্ছে ভারতবর্ষ,
আর ভেতরে বসে
এক মহান তারকা
প্রথমবার নিজের দিকে তাকাচ্ছেন।
সত্যজিৎ রায়ের ‘নায়ক’।
অরিন্দম মুখার্জি—
সে কি শুধু সিনেমার নায়ক?
নাকি উত্তমেরই
অন্য এক প্রতিবিম্ব?
খ্যাতির আড়ালে
ভয় আছে,
সাফল্যের আড়ালে
অপরাধবোধ,
তারকার মুখের আড়ালে
এক নিঃসঙ্গ মানুষ।
শর্মিলা ঠাকুরের অদিতির সামনে
সেই মানুষটি ধীরে ধীরে
খুলে দেয় নিজের দরজা।
সত্যজিৎ রায়
ক্যামেরা দিয়ে তখন
শুধু উত্তমকে দেখেননি—
দেখেছিলেন ‘তারকা’ হয়ে ওঠার
মনস্তত্ত্ব।
১৯৬৬-এর সেই নায়ক
আজও আধুনিক,
আজও প্রশ্ন করে—
খ্যাতি কি সুখ?
নাকি আলো যত বাড়ে,
ছায়াটাও তত দীর্ঘ হয়?
সেই ছবিতে
উত্তমকুমার প্রমাণ করলেন—
তিনি শুধু রোম্যান্টিক নায়ক নন,
তিনি একজন অভিনেতা।
একজন তারকা
নিজের তারকাখ্যাতিকে সরিয়ে
নিজেকেই যখন অভিনয় করেন,
সেই মুহূর্তে
সিনেমা হয়ে ওঠে শিল্প।
‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’-তে
ভাষা, সুর আর সংস্কৃতির
সীমা পেরিয়ে মানুষকে দেখলেন তিনি;
‘চিড়িয়াখানা’-য়
রহস্যের অন্ধকারে
অন্য এক উত্তমকে পেলাম আমরা;
‘সন্ন্যাসী রাজা’-য়
ইতিহাসের ছায়া,
‘জীবন-মৃত্যু’-তে
অন্য রকম নাটকীয়তা—
কত রং ছিল তাঁর অভিনয়ে!
তিনি ছিলেন
বাঙালির রোম্যান্টিক নায়ক,
আবার হাসির মানুষ,
আবার বিষণ্ণ মানুষ,
আবার রাজা,
আবার সাধারণ ঘরের ছেলে।
তাই উত্তমকুমারকে
একটি বিশেষণ দিয়ে বাঁধা যায় না।
তিনি শুধু ‘হ্যান্ডসাম’ নন,
শুধু ‘রোম্যান্টিক’ নন,
শুধু ‘মহানায়ক’ও নন—
তিনি ছিলেন
বাঙালির সাংস্কৃতিক স্মৃতির এক জীবন্ত অধ্যায়।

যে বাঙালি
উত্তমকে দেখেনি,
সেও উত্তমকে চেনে—
বাবার পুরনো অ্যালবামে,
মায়ের গুনগুন করা গানে,
দাদুর বলা সিনেমার গল্পে,
পুজোর ছুটিতে পুরনো ছবির পর্দায়,
কিংবা ইউটিউবের ছোট্ট স্ক্রিনে
আজকের প্রজন্মের বিস্ময়ে।
সময় বদলেছে,
প্রযুক্তি বদলেছে,
সিনেমা দেখার মাধ্যম বদলেছে—
কিন্তু উত্তমের চোখের ভাষা
এখনও পুরনো হয়নি।
এটাই তাঁর বিস্ময়।
১৯৮০-র ২৪ জুলাই
শরীর থেমে গেল,
কিন্তু থামল না
একটি মানুষের যাত্রা।
বরং সেদিন থেকেই
উত্তমকুমার ধীরে ধীরে
মানুষ থেকে
স্মৃতি,
স্মৃতি থেকে
কিংবদন্তি,
আর কিংবদন্তি থেকে
বাঙালির আবেগ হয়ে উঠলেন।
আজ একশো বছর পরে
কলকাতার বাতাসে
আবার তাঁর নাম।
আবার পোস্টারে
সেই হাসি,
আবার আলোয়
সাদা-কালো মুখ,
আবার সিনেমার পর্দায়
সুচিত্রার পাশে উত্তম,
আবার ট্রেনের কামরায়
অরিন্দম মুখার্জি।
একশো বছর পরে
আমরা তাঁকে শুধু স্মরণ করছি না—
আবার আবিষ্কার করছি।
নতুন প্রজন্মকে বলছি—
এসো,
একবার দেখো
কীভাবে একজন অভিনেতা
একটি জাতির কল্পনাকে
এত গভীরভাবে ছুঁয়ে যায়।
কীভাবে একটি মুখ
প্রজন্মের পর প্রজন্ম
‘প্রিয়’ হয়ে থাকে।
কীভাবে একটি নাম
শুধু নাম থাকে না—
হয়ে ওঠে
একটি সময়ের পরিচয়।
উত্তমকুমার—
তুমি নেই,
তবু বাংলা সিনেমার
প্রতিটি প্রেমের দৃশ্যে
তোমার ছায়া আছে।
প্রতিটি পুরনো গানে
তোমার নিঃশ্বাস আছে।
প্রতিটি বাঙালির
নস্টালজিয়ার ভাঁজে
তোমার মুখ আছে।
আর সিনেমা হলের অন্ধকারে
যখন হঠাৎ আলো জ্বলে ওঠে,
পর্দায় ভেসে আসে
সেই চেনা মুখ—
তখন মনে হয়,
মহানায়কের মৃত্যু হয়েছিল,
কিন্তু মহানায়ক কখনও
মরে না।
শতবর্ষে তাই
শ্রদ্ধা নয় শুধু—
একটি প্রণাম
সেই শিল্পীকে,
যিনি বাঙালিকে
শুধু সিনেমা দেখাননি,
স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিলেন।
উত্তম—
তুমি তাই শতবর্ষের নও,
তুমি অনন্তের।
বাংলা সিনেমার পর্দায়
আলো যতদিন জ্বলবে,
বাঙালির হৃদয়ে
প্রেম যতদিন বেঁচে থাকবে,
ততদিন কোনও না কোনও
অন্ধকার হলঘরে
নীরবে কেউ বলবে—
“ওই যে…
উত্তম এসেছে।”
