কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার , কলকাতা, তিন আগস্ট, 2026। ভারতের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে না থাকলেও, দেশের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা সংক্রান্ত কৌশল কিংবা সংকট মোকাবিলায় অজিত ডোভালের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত এক দশকেরও বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সহযোগীদের অন্যতম তিনি।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নরেন্দ্র মোদির প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ, অজিত ডোভালকে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা (এনএসএ) পদে বসানো। তারপর থেকে দেশের একাধিক স্পর্শকাতর পরিস্থিতি, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা, সীমান্ত নিরাপত্তা, কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ কিংবা জাতীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আড়ালে নীরবে কাজ করেন তিনি। লাইম লাইটে না থেকেও দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান স্থপতি ডোভাল !
মহারাষ্ট্রের পুণেতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে অজিত ডোভালকে সম্মান জানানো হল মর্যাদাপূর্ণ লোকমান্য তিলক পুরস্কারে। দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ তাঁর হাতে এই সম্মান তুলে দেন। অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তাঁর সম্বন্ধে শাহর ভূয়সী প্রশংসা। তিনি বলেন, দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করে তোলা, প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় অজিত ডোভালের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর মতে, ইতিহাস একদিন স্বর্ণাক্ষরে অজিত ডোভালের নাম স্মরণ করবে। দেশের নিরাপত্তা ও কৌশলগত নীতিনির্ধারণে তাঁর কাজ ভবিষ্যতেও মূল্যায়িত হবে, মন্তব্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর।
পুরস্কার গ্রহণের পর নিজের বক্তব্যে অজিত ডোভাল দেশের তরুণ প্রজন্মের উদ্দেশে বিশেষ বার্তা দেন। তিনি বলেন, শুধু ইতিহাস জানলেই হবে না, স্বাধীনতা সংগ্রামী লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের আদর্শ, তাঁর চিন্তাভাবনা এবং ভারতকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের গভীরভাবে ভাবা প্রয়োজন। ডোভালের কথায়, প্রত্যেক ভারতীয় নাগরিকের, বিশেষ করে তরুণদের উচিত লোকমান্য তিলকের বাণী ও আদর্শকে আত্মস্থ করা। ভারতের জন্য তাঁর সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল। তাঁর দেশ গঠনের চেতনা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। সেই মূল্যবোধ থেকেই ভবিষ্যতের ভারত গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা পাওয়া সম্ভব, তিনি মনে করেন।
দেশের যুবসমাজের উদ্দেশ্যে তাঁর বার্তা, আজকের তরুণদের ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিৎ। ছোটখাটো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্য বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থকে কখনও বিসর্জন দেওয়া উচিত নয়। ব্যক্তিগত সুবিধা কিংবা সংকীর্ণ চিন্তাভাবনা সামনে আসলে তা পাশ কাটিয়ে দেশের জন্য কাজ করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। তাঁর মতে, একটি শক্তিশালী ও উন্নত ভারত গড়তে হলে আত্মত্যাগ, দায়িত্ববোধ এবং জাতীয় স্বার্থের প্রতি অটল অঙ্গীকারই সবচেয়ে বড় শক্তি।
ডোভাল এদিন স্বাধীনতার প্রকৃত অর্থ নিয়েও গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, স্বাধীনতা মানে যা খুশি তাই করার অধিকার নয়। স্বাধীনতার সঙ্গে দায়িত্ববোধ, শৃঙ্খলা এবং দেশের প্রতি কর্তব্যও সমানভাবে জড়িয়ে। একজন দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে প্রত্যেকেরই নিজের অধিকার ব্যবহারের পাশাপাশি দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কথাও ভাবা প্রয়োজন। তাঁর এই মন্তব্য কি দেশের সাম্প্রতিক অস্থিরতার জন্য ? কারণ, সম্প্রতি রাজধানী দিল্লির যন্তরমন্তরে তথাকথিত ‘জেন জি’র বিক্ষোভ নিয়ে দেশজুড়ে নানা বিতর্ক চলেছে।
ওই বিক্ষোভকে ঘিরে ইতিমধ্যেই নানা প্রশ্ন ! অনেকের মতে, আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। আবার অন্য একটি অংশের দাবি, বিক্ষোভের উদ্দেশ্য এবং তার পরিচালনার ধরণ নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকছেই। তাঁদের মতে, শুধু শিক্ষা সংস্কারের দাবিই নয়, আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য কিংবা সরকারকে অস্থির করার চেষ্টাও থাকতে পারে !
দেশের এই অবস্থায় অজিত ডোভালের বক্তব্য বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, মনে হয় ! দীর্ঘদিন ধরে পর্দার আড়ালে থেকে দেশের নিরাপত্তা কৌশল পরিচালনা করা এই অভিজ্ঞ কর্মকর্তা এদিন প্রকাশ্য মঞ্চ থেকেই দেশ, দায়িত্ববোধ, আত্মত্যাগ এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বের প্রতিও আস্থার ইঙ্গিত। এই বার্তার মধ্যে কি লুকিয়ে আছে, তাঁর দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি এবং ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনার প্রতিফলন ।
