ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ১০ জুলাই, ২০২৬। দিদিমার কাছে আমার শৈশব ও কৈশোর কেটেছে ৷উনি রোজ সুর করে রামায়ণ ও মহাভারত পড়তেন ৷ কখনো আমিও দিদাও তাঁর বন্ধুদের তা পড়ে শোনাতাম ৷ তখন থেকেই গান্ধারের ( আজকের আফগানিস্তানের কান্দাহার) রাজকুমারী গান্ধারীর চরিত্র আমার খুব প্রিয় ৷
ছেলেবেলার চোখ বেঁধে দিলে ভয় পেতাম ৷ ভাবতাম স্বেচ্ছায় কি করে একজন সুন্দরী ও বুদ্ধিমতী নারী কি করে স্বামী অন্ধ বলে সারা জীবন চোখ বেঁধে কাটালেন ! তারপর রবীন্দ্রনাথের
“গান্ধারীর আবেদন ” যখন পড়লাম তখন বুঝলাম চোখ থেকেও আমরা অন্ধ আর গান্ধারী চোখ ঢেকেও যেন অন্তর্যামী ৷ অসাধারন প্রজ্ঞা ও ন্যায়পরায়ন! অমিত শক্তিধর কৌরব কুলপতি ধৃতরাষ্ট্রের বধূ , দুর্যোধনের মত মহাবলবান শত পুত্রের জননী এবং শকুনির মত ধুরন্ধর ব্যক্তির বোন তথা সুবল -সুদ্রামার কন্যা হয়েও তিনি পান্ডবদের ন্যায্য পাওনা দেওয়ার পক্ষে ছিলেন ৷ বুঝেছিলেন “যতো ধর্মস্ততো জয়ঃ” বা ধর্ম যেখানে জয় সেখানে ৷ অন্তরের দৃষ্টিতে বুঝেছিলেন কুরুবংশের পতন অনিবার্য ৷ শিব ভক্ত গান্ধারী শিবের ও ব্যাসদেবের বরে একশো ছেলে ও এক মেয়ের মা হয়েছিলেন ৷ ভাগ্যের পরিহাস আগে গর্ভবতী হয়েও তাঁর প্রসব দু বছর পিছিয়ে যাওয়ায়,তাঁর সন্তান রাজা হতে পারে না ৷ আবার অন্ধ বলে যেমন সব গুণ থাকা সত্বেও ধৃতরাষ্ট্র রাজ্যভার ছোট পান্ডুকে তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিলেন ৷ তেমনি বড় হওয়ায় যুধিষ্ঠির হয়ে যান হস্তিনাপুর শাসন দাবীদার ৷ধৃতরাষ্ট্র শুধু জন্মান্ধ নন ছিলেন স্নেহান্ধ ৷ অথচ গান্ধারী নিজ পুত্রদের যেকোন খারাপ কাজের সমালোচক ৷ দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণে জড়িত কুলাঙ্গার পুত্রদের বিরুদ্ধে স্বামীর কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার আকুল আবেদন জানান ৷ পাঁচটি গ্রাম চাইলে তা দিতেও বলেন ৷ শুধু তাই নয় যুদ্ধ
যাত্রার সময় মায়ের আর্শীবাদ নিতে এলেও তিনি পুত্রদের জয়ী হওয়ার আর্শীবাদ না করে বলেন ভগবান তোমাদের মঙ্গল করুন ৷ তবে , তিনি তো মা দুর্যোধনকে অন্যায়ভাবে উরুতে গদাঘাত করে মারলে ও দুঃশাসনকে মেরে রক্ত খেতে থাকলে ভীমের প্রতি ক্রুধিত হন ৷ তবে , বিস্তারিত শুনে পরে পুত্রশোক বিস্মৃত হয়ে ভীমসহ পান্ডবদের বুকে টেনে নেন ! গান্ধারী ছিলেন অসাধারন নারী ৷ বুঝেছিলেন কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ শ্রীকৃষ্ণের খেলা ৷ কৃষ্ণকে রেগে বলেছিলেন হে গোবিন্দ তুমি সৃষ্টি স্থিতি প্রলয়ের অধিকর্তা ৷ জীবের দোষ ,গুণ , ধর্ম
অধর্ম সবই তোমাতে বর্তমান ৷ তুমি কেন ওদের ভাই ভাইয়ে বিভেদ ঘটালে ? নিজে পান্ডববের পক্ষে ও নারায়ণী সেনাদের কৌরব পক্ষে দিয়ে যুদ্ধ ঘটালে ? তুমি হিত চাইলে তো এমন হতে পারেনা ৷ ওদের নিবৃত্ত না করে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিলে কেন? কেন অর্জুনকে ইচ্ছা করে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে
বাচ্চাছেলে আদরের নাতি( অর্জুনের পুত্র) অভিমন্যুকে চক্রব্যুহর দ্বারা মারালে ৷ তুমি তো জানতে সে ওতে ঢুকতে জানলেও বের হতে জানে না ! সূর্যার্স্তের ধ্রুমজাল সৃষ্টি করে জয়দ্রথকে মারালে বিশ্বের বিধাতা হয়ে তুমি সৃষ্টি ও পালন কর ৷ এ কি করলে ? যুধিষ্টিরের রাজ্য লোভ ছিল না ৷
ধর্মপুত্রের সমান ভালবাসা ছিল কুরু – পান্ডব সব ভাইয়ের প্রতি , অর্জুনও যুদ্ধ করতে চায়নি ৷ তবু তুমি এসব করালে !যুধিষ্টিরকে দিতে অশ্বথ্থমা হত বলিয়ে দ্রোণ যখন মুহ্যমান তখন অর্জুনকে মায়া চোখে দেখালে গুরুর গলায় বিষধর কেউটে সাপ সে দ্রোণের গলার কালো উত্তরীয়কে সাপ ভেবে তীর নিক্ষেপ করে গুরুর গলায় ! ভগবান তুমি বললে সব কালে করে ৷ তুমি নিমিত্ত মাত্র ৷তুমি নিরপেক্ষ হলে তা মানতাম ৷ তখন গান্ধারী স্বয়ং ভগবানকে অভিশাপ দেন পতিসেবা করে এ জন্মের পূণ্যফলে অর্জিত পূণ্যের বলে তোমাকে অভিশাপ দিচ্ছি আজ থেকে ৩৬ বছর পরে যাদব নারীগনও কুরু পান্ডব পক্ষীয় বিধবা , সন্তানহারা নারীদের মত কাঁদবে ৷ তুমিও ছেলে , বন্ধু , আত্মীয় হারিয়ে বনের মধ্যে তীরের আঘাতে মারা যাবে ৷ এ কথায় শ্রীকৃষ্ণের ঠোঁটে মৃদু হাসি দেখা দিল ৷ মনে মনে ভাবলেন এবার তিনি এই মানব জীবনের জ্বালা থেকে মুক্তি পাবেন ৷ এও তো তাঁরই সৃষ্টি !বললেন দোষী হলে
নিশ্চয়ই তোমার অভিশাপ ফলবে ৷ আমি মনস্তাপ পাবো ৷ এই বলে ভগবান বললেন ওঠ শোক পরিত্যাগ করো ৷এই বলে মাধব গান্ধারীর সব সব শোক হরণ করলেন ৷ পাপের পতন অবশ্যম্ভাবী ৷ যুদ্ধের মধ্যে ভগবান এই লোক শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন ৷ভগবান হয়েও শ্রীকৃষ্ণ নীতিবাদী , ধার্মিক গান্ধারীর কথা মেনে নিয়েছিলেন ৷ এর মধ্যে শ্রীকৃষ্ণ দিয়েছেন নৈতিক শক্তির জনমানসে স্বীকৃতি৷ এরপর গান্ধারী, ধৃতরাষ্ট্র , কুন্তী সহ বাণপ্রস্থ নেন ৷ বনবাস কালে গান্ধারী শুধু
জল খেয়ে তপস্যা করতেন ৷ বনে যাওয়ার আগে করা যজ্ঞের আগুন থেকে দাবানল সৃষ্টি হয়ে তাঁদের সব জ্বালার অবসান হয়৷ মৃত্যুর পরেও চিরকালের জন্য লেখা হয়ে যায় মহীয়সী সতী গান্ধারীর নাম ৷
