বিদেশি লেখকদের চোখে ভারতীয় নারী বনাম পুরুষমন….।

ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় : কলকাতা, ৭ জুন, ২০২৬। ভারতবর্ষ কেবল একটি দেশ নয়; এটি এক বিশাল সভ্যতা। হাজার হাজার বছর ধরে এই দেশের মানুষ, সংস্কৃতি, ধর্ম, দর্শন ও সামাজিক সম্পর্ক পৃথিবীর নানা দেশের লেখক, ভ্রমণকারী ও চিন্তাবিদদের আকৃষ্ট করেছে। বিশেষ করে ভারতীয় নারী ও পুরুষের মনোজগৎ, পারিবারিক সম্পর্ক, প্রেম, দায়িত্ববোধ, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক ভূমিকা এবং আত্মত্যাগ বিদেশি সাহিত্যিকদের কাছে এক বিশেষ গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে।

ভারতীয় নারী ও পুরুষ সম্পর্কে বিদেশি লেখকদের মন্তব্য ও সাহিত্যকর্ম বিশ্লেষণ করে দেখেছি, তাঁরা ভারতীয় পুরুষকে সাধারণত দায়িত্বশীল, পরিবারকেন্দ্রিক, ঐতিহ্যনিষ্ঠ ও কর্তব্যপরায়ণ হিসেবে দেখেছেন; অন্যদিকে ভারতীয় নারীকে দেখেছেন সহিষ্ণু, ত্যাগী, আবেগপ্রবণ, সম্পর্করক্ষাকারী এবং আধ্যাত্মিক শক্তির আধার হিসেবে।

তবে এই ধারণাগুলি সব সময় একরৈখিক নয়। সময়, সমাজ, রাজনীতি ও লেখকের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা অনুসারে এগুলি পরিবর্তিত হয়েছে।

মেগাস্থিনিসের চোখে ভারতীয় পুরুষ

গ্রিক রাষ্ট্রদূত ও ইতিহাসলেখক Megasthenes তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Indica -তে ভারতীয় সমাজের যে বিবরণ দিয়েছেন, সেখানে ভারতীয় পুরুষদের মধ্যে সততা, সংযম ও সামাজিক শৃঙ্খলার কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে লিখেছিলেন যে ভারতীয় সমাজে চুরি-ডাকাতি তুলনামূলকভাবে কম এবং অধিকাংশ মানুষ নৈতিক বিধিনিষেধ মেনে চলে। তাঁর বর্ণনায় ভারতীয় পুরুষের মন মূলত কর্তব্য ও ধর্মবোধ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

ফা-হিয়েন ও হিউয়েন সাঙের পর্যবেক্ষণ

চীনা পরিব্রাজক Faxian এবং Xuanzang ভারতীয় সমাজকে কাছ থেকে দেখেছিলেন।

তাঁদের বিবরণে ভারতীয় পুরুষের ধর্মনিষ্ঠা ও শিক্ষাপ্রীতির উল্লেখ পাওয়া যায়। একই সঙ্গে ভারতীয় নারীর শালীনতা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ ও ধর্মীয় অনুশাসনের প্রতিও তাঁদের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল।

তাঁরা লক্ষ করেছিলেন যে ভারতীয় পরিবারে নারীরা কেবল গৃহপরিচালক নন, বরং সংস্কৃতি ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ধারক।

মার্কো পোলোর ভারত দর্শন

Marco Polo ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ভারতীয় নারী-পুরুষের চরিত্র সম্পর্কে লিখেছিলেন।

তাঁর লেখায় ভারতীয় পুরুষের সাহসিকতা ও বাণিজ্যিক দক্ষতার প্রশংসা রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় নারীদের সৌন্দর্য, ধৈর্য ও পারিবারিক নিবেদনের কথাও উঠে এসেছে।

মার্কো পোলোর চোখে ভারতীয় নারী ছিলেন পরিবারের আবেগিক কেন্দ্রবিন্দু।

আব্বে দুবোয়া ও ভারতীয় পারিবারিক মন

ফরাসি মিশনারি Jean-Antoine Dubois তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ Hindu Manners, Customs and Ceremonies -এ ভারতীয় সমাজের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়েছেন।

তিনি দেখেছিলেন যে ভারতীয় পুরুষ পরিবার ও বংশের মর্যাদা রক্ষায় বিশেষভাবে সচেতন। অন্যদিকে ভারতীয় নারী নিজের ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে প্রায়শই পরিবারের কল্যাণের জন্য বিসর্জন দেন।

তাঁর মতে ভারতীয় সমাজে পুরুষের মন বেশি সামাজিক দায়িত্বকেন্দ্রিক, আর নারীর মন বেশি সম্পর্ককেন্দ্রিক।

ক্যাথরিন মায়োর বিতর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি

আমেরিকান লেখিকা Katherine Mayo তাঁর Mother India গ্রন্থে ভারতীয় নারীদের অবস্থান নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেছিলেন।

যদিও তাঁর লেখা নিয়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে, তবু একটি বিষয় স্পষ্ট—তিনি ভারতীয় নারীদের দুর্দশা, বাল্যবিবাহ, শিক্ষার অভাব ও সামাজিক বৈষম্যের প্রসঙ্গ সামনে এনেছিলেন।

তাঁর চোখে ভারতীয় নারীমন ছিল প্রতিবন্ধকতার বিরুদ্ধে নীরব সংগ্রামের প্রতীক।

পার্ল এস. বাকের ভারতীয় নারী

নোবেলজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক Pearl S. Buck এশীয় সমাজের নারীজীবন নিয়ে বহু লিখেছেন।

তাঁর বিশ্লেষণে ভারতীয় নারী একদিকে কোমল, অন্যদিকে অসাধারণ মানসিক শক্তির অধিকারিণী। তিনি দেখিয়েছেন, ভারতীয় নারী বহু সময় নিজের স্বপ্ন বিসর্জন দিয়ে পরিবারকে টিকিয়ে রাখেন।

ই. এম. ফস্টারের ভারতচিত্র

ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক E. M. Forster তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস A Passage to India -এ ভারতীয় নারী-পুরুষের মানসিকতা নিয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করেছেন।

ফস্টারের মতে ভারতীয় পুরুষের মধ্যে যুক্তি ও আবেগের এক অদ্ভুত সমন্বয় রয়েছে। একই সঙ্গে ভারতীয় নারীরা সমাজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে থেকেও নিজের আবেগ ও মানবিক শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখেন।

মার্ক টোয়েনের বিস্ময়

Mark Twain ভারত ভ্রমণের পর লিখেছিলেন Following the Equator।

তিনি ভারতীয়দের ধর্মবিশ্বাস ও পারিবারিক বন্ধনের গভীরতায় বিস্মিত হয়েছিলেন।

তাঁর মতে ভারতীয় পুরুষের চিন্তায় ধর্ম ও পরিবার অবিচ্ছেদ্য; আর ভারতীয় নারীর আত্মত্যাগ প্রায় কিংবদন্তিতুল্য।

রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের দৃষ্টিতে

Rudyard Kipling এর বহু গল্পে ভারতীয় নারী-পুরুষের চরিত্র উঠে এসেছে।

কিপলিং ভারতীয় পুরুষকে ধৈর্যশীল ও ভাগ্যনির্ভর হিসেবে দেখেছেন। ভারতীয় নারীদের ক্ষেত্রে তিনি দেখেছেন সহনশীলতা, মমত্ব ও পারিবারিক আনুগত্য।

হারমান হেসে ও ভারতীয় মন

জার্মান সাহিত্যিক Hermann Hesse তাঁর Siddhartha গ্রন্থে ভারতীয় দর্শনের গভীর প্রভাব দেখা যায়।

হেসের মতে ভারতীয় পুরুষের মন আত্মঅনুসন্ধানী, আর ভারতীয় নারীর মন জীবনের বাস্তব ও সম্পর্কমুখী দিককে অধিক গুরুত্ব দেয়।

অক্টাভিও পাজের বিশ্লেষণ

মেক্সিকান নোবেলজয়ী কবি ও কূটনীতিক Octavio Paz ভারতে দীর্ঘদিন অবস্থান করেছিলেন।

তাঁর রচনায় ভারতীয় নারীর রহস্যময়তা, আত্মসংযম ও সাংস্কৃতিক শক্তির উল্লেখ পাওয়া যায়। ভারতীয় পুরুষকে তিনি দেখেছেন ঐতিহ্য ও আধুনিকতার মধ্যে ক্রমাগত ভারসাম্য খোঁজার চেষ্টা করতে।

ভারতীয় নারীমন

বিদেশি লেখকদের বর্ণনা একত্রে বিচার করে আমার ধারণায় ভারতীয় নারীমনের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করেছি, যা একজন ভারতীয় হিসেবে গর্বিত করেছে। ভারতীয় নারীমনে –

১. সম্পর্ককেন্দ্রিকতা

২. মাতৃত্ববোধ

৩. আত্মত্যাগের প্রবণতা

৪. সহিষ্ণুতা

৫. আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা

৬. সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষা

৭. ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক সংযোগ দেখা যায়।

নারী সাধারণত মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের জাল তৈরি করেন। তিনি পরিবারকে কেবল সামাজিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, আবেগের আশ্রয় হিসেবে দেখেন।

ভারতীয় পুরুষমন

বিদেশি পর্যবেক্ষকদের মতে ভারতীয় পুরুষমনের প্রধান বৈশিষ্ট্যও আমাদের সভ্যতা ও সমাজ সম্পর্কে আমাকে মুদ্ধ করেছে। তা হলো –

১. কর্তব্যবোধ

২. সামাজিক দায়িত্বশীলতা

৩. ধর্মীয় বিশ্বাস

৪. আত্মমর্যাদাবোধ

৫. পরিবার রক্ষার প্রবণতা

৬. কর্মমুখিতা

৭. ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধা

ভারতীয় পুরুষের মানসিকতা ঐতিহাসিকভাবে পরিবার ও সমাজের দায়িত্ব বহনের সঙ্গে যুক্ত।

মনোবৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ

আধুনিক মনোবিজ্ঞান পড়ে একজন মনোবিদ হিসেবে বলতে পারি – নারী ও পুরুষের মৌলিক মানবিক অনুভূতি একই হলেও সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া তাদের আচরণে পার্থক্য সৃষ্টি করে।

ভারতীয় সমাজে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই সম্পর্ক রক্ষা, সহমর্মিতা ও ত্যাগের শিক্ষা দেওয়া হয়। ছেলেদের শেখানো হয় দায়িত্ব, প্রতিযোগিতা ও সাফল্যের মূল্য।

ফলে নারীমন অধিকতর আবেগসংবেদনশীল এবং পুরুষমন অধিকতর সমস্যাসমাধানমুখী বলে প্রতীয়মান হয়। তবে এটি কোনো জৈবিক অনিবার্যতা নয়; বরং আমাদের সামাজিক, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক প্রভাবের ফল।

উপসংহার

বিদেশি লেখকদের চোখে ভারতীয় নারী ও পুরুষ দুই ভিন্ন জগতের প্রতিনিধি হলেও তারা পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং পরিপূরক। ভারতীয় নারীমনের শক্তি নিহিত রয়েছে ভালোবাসা, মমতা, সহিষ্ণুতা ও সম্পর্করক্ষায়। ভারতীয় পুরুষমনের শক্তি নিহিত রয়েছে দায়িত্ববোধ, কর্তব্যনিষ্ঠা, আত্মমর্যাদা ও সামাজিক নেতৃত্বে।

কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর ভারত নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি। আজ নারী কর্মক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন, পুরুষও পরিবার ও সন্তান পালনের দায়িত্ব ভাগ করে নিচ্ছেন। ফলে নারীমন ও পুরুষমনের ঐতিহ্যগত পার্থক্য ধীরে ধীরে কমছে। তবুও ইতিহাস, সাহিত্য ও বিদেশি পর্যবেক্ষকদের লেখনী আমাদের শেখায় যে ভারতীয় সমাজের প্রাণশক্তি নিহিত রয়েছে নারী ও পুরুষের পারস্পরিক সহযোগিতা, সহমর্মিতা এবং মানসিক পরিপূরকতার মধ্যে।

এই কারণেই ভারতীয় নারীমন ও পুরুষমনকে সংঘাতের নয়, বরং যুগল বিকাশের আলোকে বিচার করাই অধিক যুক্তিযুক্ত। ভারতীয় নন এমন বহু বিদেশি লেখক, ভ্রমণকারী, ঔপন্যাসিক ও চিন্তাবিদের রচনায় ভারতীয় নারী ও পুরুষ সম্পর্কে যে ধারণা, পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ আমার জ্ঞান মতো তুলে ধরলাম।

 

More From Author

বিশ্ব পরিবেশ দিবসে পৃথিবীর আর্তি….।

ফিরে আসুক আমাদের সেই পুরাতন দুর্গাপুজো…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *