ডাঃ দীপালোক বন্দ্যোপাধ্যায় ৷ কলকাতা।
বিঘ্নহর্তা গণেশ তুমি, সিদ্ধিদাতা নাম,
তোমার মাঝে জ্ঞানের আলো, মুছে অজ্ঞান-তাম।
মাটির মূর্তি নও শুধু যে, প্রতীক গভীর জ্ঞান,
তোমার রূপে খুঁজে পাই যে আত্মার সন্ধান।
বিশাল তোমার মস্তক বলে—ভাবনাকে করো বড়,
সংকীর্ণতার গণ্ডি পেরিয়ে সত্যের পথে চলো।
বড় দুটি কান বলে—শোনো, মন দিয়ে সব কথা,
শুনতে শেখাই জ্ঞানের শুরু, কমুক মনের ব্যথা।
ছোট দুটি চোখ শেখায় আমায় একাগ্রতার সাধন,
লক্ষ্যপানে স্থির দৃষ্টিই সাফল্যের কারণ।
দীর্ঘ শুঁড়টি বলে—শেখো স্থূল-সূক্ষ্মের জ্ঞান,
কখন কঠোর, কখন কোমল—এই তো প্রজ্ঞার প্রাণ।
একটি দাঁত বলে—এক সত্যের সন্ধান করো মনে,
দ্বন্দ্ব পেরিয়ে ঐক্য খোঁজো আপন অন্তঃকোণে।
দুটি দাঁতের দ্বৈততাকে একের মাঝে মেলো,
‘আমি’ ‘তুমি’র দেয়াল ভেঙে অদ্বৈত আলো পেলো।
লম্বোদর তোমার শেখায়—ধারণ করো সব,
সুখ-দুঃখ আর নিন্দা-প্রশংসা, জীবন যত রব।
কিন্তু বিষকে রেখো না যে হৃদয়েরই ঘরে,
শিক্ষা নিয়ে ছেড়ে দাও তা, শান্তির সাগর তরে।
হাতে তোমার কুঠার বলে—আসক্তি দাও ছেঁটে,
লোভ-অহং-ভ্রান্ত সংস্কার ফেলো দূরে হেঁটে।
পাশটি বলে—নিজেকে রাখো সংযমেরই বাঁধনে,
অঙ্কুশ বলে—চঞ্চল মন আনো জ্ঞানের শাসনে।
হাতে তোমার মোদক যেন সাধনার মিষ্টি ফল,
একাগ্রতা, শ্রমে মেলে জীবনেরই বল।
আজ যে বীজ পুঁতবে তুমি কর্মের উর্বর ক্ষেতে,
কাল সে ফল ফিরবে তোমার জীবনেরই হাতে।
পদ্ম তোমার শেখায়—থাকো সংসারেরই মাঝে,
কাদার মধ্যে থেকেও যেন নির্মল থাকো কাজে।
জলের মাঝে পদ্ম যেমন জলে নাহি মেশে,
সংসারে থেকেও মানুষ যেন অন্তর শুদ্ধ রাখে।
ক্ষুদ্র ইঁদুর বাহন তোমার—চঞ্চল মনের ছায়া,
লোভ-বাসনা, অস্থিরতা, অহংকারের মায়া।
বিশাল জ্ঞানের পায়ের তলে রাখো তাকে তাই,
মনকে জয় না করলে সত্যিই মুক্তি নাই ৷
ঋদ্ধি-সিদ্ধি পাশে তোমার—সমৃদ্ধি আর জয়,
জ্ঞান-বিবেক সঙ্গে থাকলে সাফল্য মঙ্গলময়।
শুধু ধন বা শুধু যশে জীবনের কী মান?
জ্ঞানের আলোয় সার্থক হোক অর্জনের সম্মান।
তুমি বলো—বিঘ্ন শুধু কি পথের বাইরের বাধা?
অন্তরেও লুকিয়ে থাকে কত অন্ধকার সাধা।
কাম, ক্রোধ ,লোভের আগুন, অহংকারের জাল,
অজ্ঞতারই বন্ধন যত—সেটাই বড় কাল।
তাই হে গণেশ, প্রার্থনা আজ তোমার চরণতলে—
বাইরের বাধা সরিও আগে অন্তর শুদ্ধ হলে।
সাফল্য দিও, দিও সঙ্গে তাকে রাখার জ্ঞান,
সমৃদ্ধি দিও, দিও সেবার উদার প্রাণ।
মূর্তির মাঝে তোমায় খুঁজি, প্রতীকেরই ভাষায়,
শেষে যেন তোমায় খুঁজি নিজের অন্তর-আত্মায় ।
মাটির গণেশ বিসর্জনে জলে যখন যান,
তাঁর শিক্ষাগুলি থেকে যাক আমাদের প্রাণে-প্রাণ।
বড় হোক চিন্তা, গভীর হোক শ্রবণ,
একাগ্র হোক দৃষ্টি, শুদ্ধ হোক মন।
কর্ম হোক নিষ্ঠার, অহং হোক ক্ষয়,
জ্ঞান হোক আলো, সকলের হোক জয়।
তখন তুমি মণ্ডপে নও, নও শুধু প্রতিমায়,
থাকবে তুমি বিবেক হয়ে মানুষের হৃদয়ে আশ্রয় ।
বিঘ্নহর্তা, সিদ্ধিদাতা, জ্ঞানের মহাদীপ—
তোমার আলোয় অন্তর হোক অজ্ঞানমুক্ত, নিখিলদীপ।
ওঁ গং গণপতয়ে নমঃ—
জ্ঞান জাগুক অন্তরে, মঙ্গল হোক সর্বত্র।
