১৮ বছর ট্রানজিটে আটকে থাকা এক মানুষের গল্প। এয়ারপোর্টই যার ঘর, এয়ারপোর্টেই শেষ নিঃশ্বাস…।

শ্যামল চক্রবর্তী : কলকাতা, ৭ আগস্ট, ২০২৬। ১৮ বছর ট্রানজিটে আটকে থাকা এক মানুষের গল্প।এয়ারপোর্টই যার ঘর, এয়ারপোর্টেই শেষ নিঃশ্বাস। কাগজ হারালে কি মানুষের জীবনও হারিয়ে যায়? মেহরান কারিমি নাসেরির জীবনের উত্তর—হ্যাঁ।

ইরানি শরণার্থী মেহরান কারিমি নাসেরি প্যারিস হয়ে যাত্রা করছিলেন, তখনই এক অদ্ভুত মোড় নেয় তার জীবন। প্যারিসের একটি ট্রেন স্টেশনে তার শরণার্থী কাগজপত্র চুরি হয়ে যায়। পরিচয়পত্র ছাড়া ফরাসি পুলিশ তাকে কোথাও পাঠাতে পারল না—না ইরানে, না অন্য কোনো দেশে।

২৬ আগস্ট ১৯৮৮, তিনি এসে পড়লেন চার্লস দ্য গল এয়ারপোর্টে। আর সেখানেই থেকে গেলেন।

পরবর্তী ১৮ বছর, টার্মিনাল–১ হয়ে উঠল তার ঘর। দোকান আর রেস্তোরাঁর পাশের প্লাস্টিকের বেঞ্চে ঘুম, ব্যাগ–স্যুটকেসে ঘেরা ছোট্ট এক জগৎ। তিনি ডায়েরি লিখতেন, রেডিও শুনতেন, পাইপে ধোঁয়া তুলতেন, ম্যাকডোনাল্ডসের খাবার খেতেন।

এয়ারপোর্টের কর্মীরা তাকে ডাকত “স্যার আলফ্রেড” নামে। কেউ খাবার এনে দিত, কেউ গল্প করত। যাত্রীরা চিঠি পাঠাত, অনেকে শুধু লে’ওভারে এসে তাকে একবার দেখার আশায়।

নাসেরির জন্ম ১৯৪৫ সালে ইরানে। ১৯৭৪ সালে পড়াশোনার জন্য ইংল্যান্ডে যান। ফিরে এসে দাবি করেন, শাহবিরোধী আন্দোলনের কারণে তাকে আটক করা হয় এবং পাসপোর্ট ছাড়াই দেশছাড়া করা হয়। ইউরোপজুড়ে রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করেন, কিন্তু বারবার প্রত্যাখ্যাত হন।

অবশেষে বেলজিয়ামে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা তাকে কাগজ দেয়—কিন্তু সেই কাগজই প্যারিসে চুরি হয়ে যায়।

ফরাসি আমলাতন্ত্র আর ইউরোপের কঠোর অভিবাসন আইন তাকে ঠেলে দেয় এক অদ্ভুত আইনগত শূন্যতায়।

কাগজ ছাড়া ফ্রান্সে ঢোকা যায় না, পাসপোর্ট ছাড়া ফ্রান্স ছাড়া যায় না। এয়ারপোর্ট হয়ে ওঠে এমন এক নো–ম্যান’স ল্যান্ড, যেখানে তিনি দেশহীন এক মানুষ। তার গল্প ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।

২০০৪ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গ নির্মাণ করেন “The Terminal”, টম হ্যাঙ্কস অভিনীত—এই গল্প থেকেই অনুপ্রাণিত। স্পিলবার্গ নাকি গল্পের স্বত্বের জন্য ২ লাখ ৫০ হাজার ডলার দেন।

এ ছাড়া তৈরি হয় ফরাসি চলচ্চিত্র “Lost in Transit”, একটি অপেরা “Flight”, আর নাসেরি লেখেন আত্মজীবনী “The Terminal Man”।

অদ্ভুতভাবে, কাগজ পাওয়ার পরও তিনি এয়ারপোর্ট ছাড়তে চাননি। সেটাই ছিল তার চেনা জগৎ। ২০০৬ সালে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাকে সেখান থেকে বের করা হয়। এরপর প্যারিসের আশ্রয়কেন্দ্র ও হোস্টেলে থাকেন, নিজের গল্প বিক্রির টাকায় জীবন চালান। কিন্তু এয়ারপোর্ট তাকে ছাড়েনি—আর তিনিও এয়ারপোর্টকে নয়।

সেপ্টেম্বর ২০২২, তিনি আবার ফিরে আসেন চার্লস দ্য গলে।

১২ নভেম্বর ২০২২, ৭৬ বছর বয়সে টার্মিনাল ২এফ–এ হৃদ্‌রোগে মারা যান মেহরান কারিমি নাসেরি। যে জায়গা তাকে ১৮ বছর বন্দি করে রেখেছিল, সেই জায়গাতেই তিনি শেষ দিনগুলো কাটাতে চেয়েছিলেন। এয়ারপোর্ট কর্তৃপক্ষ বলেছিল—তারা তাকে যথাসাধ্য দেখাশোনা করেছে, তবে আফসোস, তিনি কখনো “আসল আশ্রয়” খুঁজে পাননি।

প্রায় দুই দশক ধরে, মেহরান কারিমি নাসেরি ছিলেন চার্লস দ্য গল এয়ারপোর্টের প্রথম এবং একমাত্র নাগরিক।

একজন মানুষ—যিনি কখনো গন্তব্যে পৌঁছাননি, আর যাত্রীদের জন্য বানানো এক জায়গায়—নিজেই হয়ে উঠেছিলেন স্থায়ী বাসিন্দা।

ছবি : সংগৃহীত

More From Author

তদন্তের দাবী, রিঙ্কু চট্টোপাধ্যায় সিংয়ের…।

Science City Kolkata Hosts Inspiring Interactive Session on “Nature Photography: Myth, Reality & Purpose…

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *