কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার : কলকাতা, ২৯ জুন, ২০২৬। বয়স যে কেবল একটি সংখ্যামাত্র, তা আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন ষাটোর্ধ্ব এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী বসন্ত সিংহরায়। তাঁর অভিজ্ঞ নেতৃত্বে হিমাচল প্রদেশের ৬,০৬৯ মিটার উচ্চতার অত্যন্ত দুর্গম ও দীর্ঘদিন প্রায় বিস্মৃত ‘মুকার বে’ শৃঙ্গ সফলভাবে জয় করলেন কৃষ্ণনগরের মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন অব কৃষ্ণনগর (ম্যাক)-এর চার সদস্যের একটি দল। বসন্ত সিংহরায়ের সঙ্গে এই অভিযানে ছিলেন বিশ্বনাথ সাহা, পার্থসারথি লায়েক এবং নদীয়ার নবদ্বীপের বামুনপুকুর হাই স্কুলের শিক্ষক প্রশান্ত সিংহ। দীর্ঘ প্রস্তুতি, কঠিন অনুশীলন এবং একাধিক প্রাকৃতিক বাধা অতিক্রম করে ২৩ জুন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে তাঁরা সফলভাবে মুকার বে শৃঙ্গ স্পর্শ করেন।
এই অভিযানের সূচনা ৬ জুন। সেদিন কৃষ্ণনগর থেকে যাত্রা শুরু করেন চার অভিযাত্রী। হুন্ডার থেকে শুরু হয় তাঁদের পদযাত্রা। টানা দু’দিন দুর্গম পাহাড়ি পথে হাঁটার পর তাঁরা পৌঁছান বিয়াস কুন্ডে, যা বিপাশা নদীর উৎসস্থল হিসেবে পরিচিত। এখান থেকেই হাঁটা শুরু। বরফে ঢাকা খাড়া ঢাল, হিমবাহ, পাথুরে পথ এবং অনিশ্চিত আবহাওয়াকে সঙ্গী করেই এগোতে থাকে তাঁদের অভিযান।
মুকার বে শৃঙ্গের বিশেষত্ব হল, প্রায় ৬৫ বছর আগে শেষবার এই শৃঙ্গে উল্লেখযোগ্য অভিযান হয়েছিল ! তারপর এত দীর্ঘ সময় এই রুটে আর তেমন কোনও অভিযান হয়নি ! কারণ, এই পথ অত্যন্ত টেকনিক্যাল, দুর্গম এবং ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ের প্রতিটি ধাপেই লুকিয়ে বিপদের সম্ভাবনা ! তাই বহু বছর ধরে এই শৃঙ্গ কার্যত অভিযাত্রীদের নাগালের বাইরেই ছিল।
অভিযানের অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে প্রশান্ত সিংহ জানান, মুকার বে-র পথে অসংখ্য হিমবাহের ফাটল বা ক্রেভাস রয়েছে। তার সঙ্গে গ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের প্রভাবে বরফ গলে গিয়ে বহু জায়গায় পাথুরে কার্নিস বেরিয়ে এসেছে। ফলে গত কয়েক দশকে পথ আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। তিনি জানান, অভিযানের সময় তিনটি শৃঙ্গে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা সম্ভব হলেও সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল চতুর্থ এবং মূল লক্ষ্য—মুকার বে শৃঙ্গে পৌঁছনো।
তিনি আরও বলেন, মানালি শৃঙ্গ অভিযানের সময় প্রায় ২ হাজার মিটার দড়ি ব্যবহার করতে হয়েছে। খাড়া বরফের দেওয়াল, ধারালো কার্নিস এবং ঢিলা পাথরের মধ্য দিয়ে রক ক্লাইম্বিং করে এক ধাপ এক ধাপ এগোতে হয়েছে। ক্র্যাম্পন লাগানো ভারী জুতো পরে সেই দুর্গম পথ পেরোনো ছিল অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। এর মধ্যেই প্রতিকূল আবহাওয়া, সামিট ক্যাম্পে টানা প্রায় ২৭ ঘণ্টা তাঁবুর মধ্যেই আটকে থাকতে হয়। বাইরে তখন প্রবল প্রতিকূল পরিস্থিতি। আবহাওয়া কিছুটা অনুকূলে আসতেই আবার শুরু শৃঙ্গ জয়ের শেষ লড়াই। সমস্ত বাধা, ক্লান্তি এবং ঝুঁকি জয় করে অবশেষে ২৩ জুন সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে মুকার বে শৃঙ্গে পৌঁছে ভারতের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন তাঁরা।
অভিযানের সাফল্য নিয়ে বসন্ত সিংহরায় বলেন, এই বয়সে এসে এমন একটি কঠিন শৃঙ্গ জয় করা তাঁর কাছেও অপ্রত্যাশিত ছিল। তবে ব্যক্তিগত সাফল্যের চেয়েও তাঁর কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, দলের প্রত্যেক সদস্যকে নিরাপদে শৃঙ্গ জয় করিয়ে সুস্থভাবে ফিরিয়ে আনা। তিনি জানান, যে সমস্ত জায়গায় বিপদের আশঙ্কা, সেখানে অভিজ্ঞতার জোরে যতটা সম্ভব ঝুঁকি কাটিয়ে এগোনোর চেষ্টা করা। তাঁর নেতৃত্ব, সাহস এবং অভিজ্ঞতার ফলেই এই কঠিন অভিযান সফলভাবে সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়েছে।
এই সাফল্য শুধু চারজন পর্বতারোহীর ব্যক্তিগত কৃতিত্ব নয়, বরং নদীয়া জেলার পর্বতারোহণের ইতিহাসেও এক গর্বের অধ্যায়। একই সঙ্গে ষাটোর্ধ্ব বসন্ত সিংহরায়ের এই সাফল্য আবারও প্রমাণ করে দিল, স্বপ্ন দেখার, নতুন চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার এবং অসম্ভবকে সম্ভব করে তোলার ক্ষেত্রে বয়স কখনওই বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। সাহস, প্রস্তুতি, অভিজ্ঞতা এবং অদম্য মানসিক শক্তিই শেষ পর্যন্ত মানুষকে পৌঁছে দেয় সাফল্যের সর্বোচ্চ শিখরে।
আমাদের তরফ থেকে বসন্ত সিংহ রায় এবং তাঁর সহযোগিদের জানাই আন্তরিক অভিনন্দন।
