মাত্র দু বছরের খুদে হাত, হিমালয়ান সহযোগিতা…।

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার,  কলকাতা,  ২৮ জুন, ২০২৬। সমাজ বদলের স্বপ্ন কি শুধুই বড়দের একচেটিয়া ! নাকি সেই স্বপ্নের বীজ রোপণ করা যায় একেবারে শৈশবেই ? এই প্রশ্নের উত্তর দু’বছরের এক খুদের কাছে ! এখনও সে পৃথিবীটাকেই চিনে উঠতে পারেনি ঠিকই, কিন্তু মানবিকতার পাঠ তার শিরায় ! আসলে তাঁর নামটাই তো অদ্ভিতা মুখোপাধ্যায়। অদ্ভুতের সঙ্গে কেমন এক মিল না ! তাই তো হিংসা, প্রতিহিংসা, বিভাজন আর কলুষিত রাজনীতির সময়ে নিঃশব্দে সমাজের পাশে দাঁড়ানোর এক অন্যরকম বার্তা এই ছোট্ট শিশুর ! তার এই উদ্যোগের কথা নিজের ফেসবুক পোস্টে তুলে ধরেছেন সিপিএম নেতা কলতান দাশগুপ্ত।

সম্প্রতি বাগবাজারের বাসিন্দা অদ্ভিতা দু’বছরে পা দিয়েছে। জন্মদিন বলে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়-স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে পেয়েছে নানা উপহার। সেই উপহারের মধ্যেই ছিল কিছু নগদ। সাধারণত এই বয়সের শিশুদের এই টাকা দিয়ে খেলনা বা মিষ্টি কিনে দেওয়া হয়। বেশী অর্থ হলে, তার নামে ইনভেস্ট ! কিন্তু অদ্ভিতার জন্মদিনের সেই সমস্ত অর্থের একটিও খরচ না করে পুরো টাকাটাই তুলে দেওয়া হল সম্প্রতি উচ্ছেদ হওয়া হকারদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে ! সেই অর্থ পৌঁছে দেওয়া হল সিপিএমের হাতে, কারণ ওই হকারদের পাশে দাঁড়িয়ে আন্দোলন করছে দল।

শুক্রবার বিকেলে মা-কে সঙ্গে নিয়ে অদ্ভিতা পৌঁছয় আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে বিমান দাদুর কাছে ! আগে থেকেই বামফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান বসুর সঙ্গে দেখা করার সময় চেয়ে রাখা হয়েছিল। বিকেল প্রায় তিনটে নাগাদ তাঁরা পৌঁছলে, প্রথমে খানিকটা হকচকিয়ে যান বিমান বসু ! অবাকও ! মাত্র দু’বছরের একটি শিশু দেখা করতে এসেছে, তা প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না তিনি ! কিন্তু অদ্ভিতার আগমনের উদ্দেশ্য জানতে পেরে আবেগাপ্লুত ভেসে যান ! খুশি মনে ছোট্ট অতিথিকে সাদর আমন্ত্রণ তাঁর !

প্রায় আধঘণ্টা ধরে দুই অসমবয়েসীর খোশ গল্প ! চুরাশি বছরের ব্যবধান নিমেষে উধাও ! সেখানে কয়েক মুহূর্তের জন্য যেন এক অদ্ভুত বন্ধুত্বের সেতু ! বিদায়ের আগে নিজের হাতে একটি চকোলেট তুলে দেন অদ্ভিতার হাতে। তাকে আশীর্বাদ করে বলেন, “ভালো করে পড়াশোনা করো।”

অদ্ভিতার মা জানান, তাঁদের ইচ্ছে ছিল পার্টির লাইব্রেরি থেকে মেয়ের জন্য বিমান বসুর কোন বই সংগ্রহ করার। স্বাভাবিক ভাবেই, দু’বছরের শিশুর উপযোগী বই সেখানে নেই। তখন বিমান বসুই পরামর্শ দেন, যোগীন্দ্রনাথ সরকারের বিখ্যাত বই ‘হাসিখুশি’ কিনে দিতে !

অনেকের মনেই প্রশ্ন, এত ছোট বয়স থেকেই কি অদ্ভিতাকে সিপিএমের আদর্শে গড়ে তোলার চেষ্টা বাবা-মার ! তাঁরা স্পষ্ট জানান, বিষয়টি মোটেই তা নয়। অদ্ভিতার মা-বাবা দু’জনেই ছাত্রজীবনে এসএফআইয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং এখনও বিভিন্ন সমাজসেবামূলক কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। তাঁদের কথায়, বিশেষ বিশেষ দিনে তাঁরা বরাবরই পার্টি অফিস বা সিপিএমের বিভিন্ন উদ্যোগে কিছু না কিছু সহযোগিতা করেন। এবার মেয়ের দ্বিতীয় জন্মদিনে পাওয়া অর্থটুকুই তাঁরা উচ্ছেদ হওয়া হকারদের জন্য তুলে দিলেন। হয়ত সামান্য, তবু কোনও বিপন্ন মানুষের কাজে হয়ত লাগবে তাঁদের আশা।

নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে গেল ! কারুকে কিছু দিতে হলে, বাবা নাকি আমার হাত দিয়ে দেওয়াত ! মাকে নাকি বলত, দিতে শিখুক !দেওয়ার হাত তৈরী হবে। অদ্ভিতার বাবা মাকে ধন্যবাদ সেই কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য !

এই ঘটনার নেপথ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শের কচকচিতে যাবনা, কিন্তু তার মানবিক বার্তাকে অস্বীকার করি কি করে ! ছোট্ট অদ্ভিতা সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এক প্রতীক। বয়সে সে এখনও খুবই ছোট, তবু মানবিকতার এই ছোট্ট আলোই হয়তো আগামী দিনে সমাজকে আরও সুন্দর করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখাবে।

অদ্ভিতার জন্য থাকল আমাদের তরফ থেকে অনেক শুভেচ্ছা আর শুভকামনা। আর ওর বাবা মাকে হ্যাটস অফ।

 

 

More From Author

কলকাতায় ঐতিহাসিক চিঁড়া-দধি মহোৎসবের সূচনা, কয়েকশো ভক্ত সমাগম…।

আর পি এ ন্যাশনাল জার্নালিজম এওয়ার্ড- ২০২৬…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *