প্রকৃতি এবং এমবাপে! দুই ঝড়ে ছারখার ইরাক….।

ফ্রান্স ৩ (এমবাপে ২, দেম্বেলে)  ইরাক ০

কঙ্ক ঘোষ দস্তিদার  : কলকাতা, ২৩ জুন, ২০২৬। ফিলাডেলফিয়ার আকাশে একসঙ্গে আরেক প্রতিপক্ষের মুখোমুখি, ফ্রান্স আর ইরাক! বজ্রগর্ভ ঝড়-বৃষ্টি ! কিন্তু শেষ পর্যন্ত কেউই থামাতে পারল না দিদিয়ের দেশঁর দলকে। প্রকৃতির রুদ্ররূপ আর প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ—দুটোকেই উড়িয়ে দিল ! ৩-০ গোলে জয় ‘লে ব্লুজ’ এর। সেই সঙ্গে গ্রুপ ‘আই’ থেকে প্রথম দল হিসেবে নিশ্চিত করল বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের টিকিট। আর এই জয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন কিলিয়ান এমবাপে। দেশের হয়ে শততম ম্যাচে জোড়া গোল করে তিনি শুধু দলকে জেতালেন না, বিশ্বকাপের ইতিহাসেও লিখলেন নতুন অধ্যায়।

ম্যাচের আগে ইরাক কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড আত্মবিশ্বাসী সুরেই বলেছিলেন, তিনি কখনও হার এড়ানোর জন্য মাঠে নামেন না, সবসময় জয়ের লক্ষ্য নিয়েই দলকে প্রস্তুত করেন। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই আত্মবিশ্বাসের প্রতিফলন খুব বেশি দেখা গেল না ! শুরু থেকেই আক্রমণের ঝড় ফ্রান্সের। প্রথম মিনিটেই মানু কোনের শট লক্ষ্যভ্রষ্ট। ইরাকও দ্রুত পাল্টা জবাবও দেয়। লেফট ব্যাক মার্চাস ডস্কি ফরাসি রক্ষণে চাপ তৈরি করেছিলেন, তবে গোলের মুখ খুলতে পারেনি তারা।

ক্রমশ ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেয় ফ্রান্স। ৭ মিনিটে মাইকেল ওলিসের শট প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডাররা রুখে দেন। কিছুক্ষণ পর সুযোগ নষ্ট করেন এমবাপে। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ম্যাচের ১৪ মিনিটে ওলিসের সঙ্গে চমৎকার ওয়ান-টু পাস খেলে বল পান এমবাপে। এরপর বক্সের বাইরে থেকে তাঁর দুর্দান্ত ডান পায়ের শট ! বল জালে ! অসহায় ইরাকি গোলরক্ষক তাকিয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারেননি। বিশ্বকাপে এটি ছিল এমবাপের ১৫তম গোল, যার ফলে তিনি ছুঁয়ে ফেলেন ব্রাজিলের কিংবদন্তি রোনালদো নাজারিওকে !

গোল হজম করার পর ইরাকও ম্যাচে ফেরার চেষ্টা চালায়। ২৭ মিনিটে ডস্কির ক্রস থেকে আলি আল হামাদির হেড সামান্য বাইরে চলে যায়। সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারলে হয়তো ম্যাচের ছবিটা কিছুটা বদলাতে পারত। তবে বল দখল, আক্রমণ এবং খেলার গতি—সব ক্ষেত্রেই এগিয়ে ছিল ফ্রান্স। যদিও প্রথমার্ধে তারা আর গোল পায়নি। ফ্রান্স ৭টি শট নিলেও লক্ষ্যে রাখতে পেরেছিল মাত্র একটি। অন্যদিকে, ম্যাচের মাঝপথেই চোট পেয়ে মাঠ ছাড়তে হয় ইরাকের গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাইকার আয়মান হুসেনকে, যা তাদের আক্রমণভাগে বড় ধাক্কা !

প্রথমার্ধের শেষে ম্যাচের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে আবহাওয়া। আগে থেকেই ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস ছিল। খেলার মাঝেই শুরু হয় প্রবল বর্ষণ। প্রথমার্ধ শেষ হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ ! বিশ্বকাপের নিয়ম অনুযায়ী স্টেডিয়ামের ৮ মাইলের মধ্যে বজ্রপাত হলে অন্তত ৩০ মিনিট খেলা বন্ধ রাখতে হবে। দর্শকদেরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। লিঙ্কন ফিনান্সিয়াল ফিল্ডের গ্যালারি কার্যত ফাঁকা ! বড় স্ক্রিনে সতর্কবার্তা ভেসে ওঠে এবং দর্শকদের বিশেষ নিরাপদ এলাকায় আশ্রয় নিতে বলা হয়। ফলে দ্বিতীয়ার্ধ শুরু হতে সময় লাগে প্রায় ২ ঘণ্টা ১৫ মিনিট। সব মিলিয়ে ম্যাচ শেষ হতে প্রায় চার ঘণ্টা সময় লাগে !

দীর্ঘ বিরতির পর মাঠে ফিরে ফ্রান্স যেন আরও ক্ষুধার্ত ! ৫৪ মিনিটে ইরাকের ডিফেন্ডার জায়েদ তাহসিন ও গোলরক্ষক আহমেদ বাসিলের ভুল বোঝাবুঝি তাদের সর্বনাশ ডেকে আনে ! লম্বা ক্লিয়ারেন্সের বদলে ছোট পাস খেলতে গিয়ে বলের নিয়ন্ত্রণ হারান তাঁরা। সুযোগ বুঝে বল কেড়ে নেন ওউসমানে দেম্বেলে এবং ফাঁকায় দাঁড়িয়ে থাকা এমবাপের উদ্দেশে বাড়িয়ে দেন। সহজ সুযোগ নষ্ট করেননি ফরাসি অধিনায়ক। নিজের দ্বিতীয় এবং দলের দ্বিতীয় গোলটি করে বিশ্বকাপে ১৬ গোলের মালিক হন তিনি। এর ফলে জার্মান কিংবদন্তি মিরোস্লাভ ক্লোসের বিশ্বকাপের ১৬ গোলের রেকর্ড স্পর্শ করেন এমবাপে ! বিশ্বকাপ ইতিহাসে এখন তাঁর সামনে রয়েছেন কেবল লিওনেল মেসি, যার গোলসংখ্যা ১৮। উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, কয়েক ঘণ্টা আগেই মেসি বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসেছেন। তারপরেই তাঁর ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন ফরাসি মহাতারকা।

দ্বিতীয় গোলের পরেও থামেনি ফ্রান্স। ৬৬ মিনিটে আবারও নিজের সৃজনশীলতার পরিচয় দেন মাইকেল ওলিসে ! তাঁর নিখুঁত থ্রু পাস, দুর্দান্ত শট, তৃতীয় গোল ! দেম্বেলে করেন। এর আগে ওলিসের একটি শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। শেষ মুহূর্তে এমবাপে হ্যাটট্রিকের সুযোগ পেলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি। তবে তাতে তাঁর কৃতিত্বে কোনও আঁচ পড়েনি।

ম্যাচ শেষে স্কোরবোর্ডে ৩-০ ফলাফলই রয়ে যায়। দেশের হয়ে শততম ম্যাচে জোড়া গোল করে এমবাপে এখন ফ্রান্সের জার্সিতে ৬০ গোলের মালিক। একই সঙ্গে বিশ্বকাপে গার্ড মুলার, রোনালদো নাজারিও এবং মিরোস্লাভ ক্লোসের মতো কিংবদন্তিদের পাশে নিজের নাম আরও উজ্জ্বল করে তুললেন তিনি।

টানা দুই ম্যাচে জয় পেয়ে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপ ‘আই’-র শীর্ষে উঠে নকআউট পর্বে পৌঁছে গেল ফ্রান্স। অন্যদিকে, পরপর দুই ম্যাচে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায়ের মুখে দাঁড়িয়ে ইরাক। তবে ফিলাডেলফিয়ার এই রাত মনে রাখা হবে মূলত এক ব্যক্তির জন্য। ঝড় ছিল, বৃষ্টি ছিল, বজ্রপাত ছিল, দীর্ঘ অপেক্ষা ছিল—কিন্তু সব কিছুকে ছাপিয়ে আলো ছড়ালেন কিলিয়ান এমবাপে ::

 

More From Author

বলিদান দিবসে রক্তদাতাদের উৎসাহ দিলেন মুখ্যমন্ত্রী…।

প্রাচীন জ্ঞানের ভাণ্ডার উন্মোচনে পালি ও ম্যানুস্ক্রিপ্ট স্টাডি, নতুন কোর্স চালু করছে ইন্ডাস ব্যান্ড ফাউন্ডেশন…।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *