“তবু বিহঙ্গ ওরে বিহঙ্গ মোর
এখনি অন্ধ বন্ধ করোনা পাখা।”
অশোক রায় : অভিনেতা ও চিত্রনাট্যকার : কলকাতা, ১৯ জুন, ২০২৬। সমস্ত আশা শেষ হয়ে গেছে মনে হলেও বা পথ চলায় ক্লান্তি ও ভয় ঘিরে ধরলেও, এখনই হাল ছেড়ে দিয়ে ডানা গুটিয়ে বসে পড়ার সময় আসেনি। প্রতিকূলতাকে জয় করার জন্য সব বাধা পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বানই ছিল কবিগুরু’র ‘দুঃসময়’ কবিতায়। আর এই ছবিতে আছে মেঘেদের সাথে কথা বলা নিশ্চিন্দিপুরের সাহিত্যিক অপু , বৃষ্টির ঝাপটায় জীবনকে ভেজানোর অদম্য প্রয়াসী দূর্গা অঙ্কিতা ব্রহ্ম ও দুঃখকে রোদে শুকিয়ে নেওয়ার কথা বলা নীতা মেহুলি সরকার, সীতা, ফুলমনি’দের লড়াইয়ের কথা।
অভিরাম আর সীতার শৈশব আর ঈশ্বরের নতুন আবির্ভাব ঘটেছিল সুবর্ণরেখা পাড়ের যন্ত্রকলে। অপু আর দূর্গার শৈশব কেটেছে নিশ্চিন্দিপুরের কাশবনের রেললাইনের পারে। আর উদ্বাস্তু কলোনী’র ছিন্নমূল নীতা আর শঙ্কর…আসলে এরা ‘অপর অথচ সবচেয়ে আপন’ প্রাণের জন্য নতুন ‘ব্যক্তিবাদী বিচ্ছিন্নতা’য় নিজেকে সরিয়ে নেওয়া…এ দুয়ের মিথস্ক্রিয়ায় একটা গল্প বলতে চেয়েছেন পরিচালক সুমন মৈত্র। প্রেক্ষাপটে সেই কাশবন, সেই ভাইবোন আর এক অজানা প্রেম আর হাজারো এক অভিযোগ নিয়ে অলৌকিক ঈশ্বরের মুখোমুখি হওয়া।
প্রতিটি সংলাপের ছত্রে ছত্রে ভিন্ন মাত্রার কথা লুকিয়ে রয়েছে এই ছবিতে। সুমন দেখাতে চাইছেন, ভারতের নতুন দিনে কার্যত নতুন কিছু কেমন অপ্রাসঙ্গিক। একজন নিখাদ রাজনৈতিক চিত্র নির্মাতার আসনে যদি নিজেকে বসানো যায় তবে দেখা যাবে, ছবির বয়ান যে এত বহুস্তরীয় ও দ্বান্দ্বিক হতে পারে তা এই সিনেমাটি না দেখলে বোঝা যাবে না। একদিকে প্রচলিত সমাজের অসঙ্গতির কথা আবার অন্যদিকে তাকেই বন্দী করছেন সংশয়ের আবর্তে।
গদ্যময় কবিতা ধর্মী সংলাপ ভুলতে বসেছে আজকের রিল সর্বস্ব ভার্চুয়াল জীবন। পড়ার অভ্যেস কমেছে তার সাথে ধৈর্য্যও কমছে তাই হয়ত চেনা ছকের বাইরের সংলাপে অনেকাংশে চলচ্চিত্রটি দীর্ঘ মনে হয়েছে। কিন্তু কাব্যিক লয় বা সুর কিন্তু পুরোমাত্রায় বজায় ছিল। সঙ্গীত পরিচালনা ও ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরিং- এ চন্দ্রিমা চক্রবর্তী পুরোপুরি সফল। সমস্ত উপাদান যেমন— রূপক, চিত্রকল্প, ছন্দ, ধ্বনিঝংকার এবং আবেগের গভীরতা সব সবকিছু ধরা পড়েছে। আর যোগ্য সঙ্গতে সিনেম্যাটোগ্রাফি দিব্যেন্দু বিশ্বাস ও কৃষ্ণ ভেলানি সিনেমাটোগ্রাফার তাকে অন্য মাত্রা দিয়েছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যের বাংলার রূপের মত সে অকৃত্রিম, জীবন্ত ও সজল। ছবির পটভূমি মানবজীবনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে উঠেছে অ২ -এর অপুও দূর্গা। এই দুই ভাইবোনের সম্পর্ক ও শৈশবের নস্টালজিয়া নিয়ে পরিচালক সত্যজিৎ রায় কালজয়ী ‘পথের পাঁচালী’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছিলেন। 
ঋত্বিক ঘটকের ‘মেঘে ঢাকা তারা’ ছবির নীতা এবং সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ছবির দুর্গা— দুটি চরিত্রই চরম পারিবারিক ও সামাজিক বঞ্চনার শিকার। এই ছবিতে দুর্গাকে দারিদ্র্যের কারণে বিনা চিকিৎসায় মরতে দিতে চায়না অপুর্ব। যেমনটা নীতা পরিবারের সকলের স্বার্থরক্ষা করতে গিয়ে এক করুণ নিয়তির মুখোমুখি হয়েছিল। আর সেই কারণেই বোধকরি ম্যাজিক রিয়ালিজমে উন্মুক্ত প্রকৃতির মাঝে রাখা স্থুল কাঠামোয় ‘জানালার ফ্রেম’ -এর বিপরীতে ‘নীতা-দূর্গা’- র দেখা হওয়াটা অপরিহার্য ছিল। আর বাঁশের নড়বড়ে সেতুতে রাখা এক পাল্লা খোলা দরজাকে মনে হয় এই ছবির ‘গেটওয়ে’। একবার দেখে এ ছবি বোঝা সহজ কাজ নয়। একজন চলচ্চিত্র শিক্ষার্থী হিসেবে আমিও ভাবতে চেয়েছি সেইভাবেই, যেভাবে পড়ে শিখেছি সত্যজিৎ রায় কিভাবে শিল্পী বিনোদবিহারীকে দেখেছেন আর ঋত্বিক ঘটক দেখেছেন শিল্পী রামকিঙ্করকে। আজ বোধহয় খানিকটা বুঝতে পারি – ‘ভাবা’ টা ‘প্রাকটিসে’র মধ্যে থাকা দরকার।
পরিবারের প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা, প্রকৃতির সাথে গভীর সংযোগ, মাতৃত্ব ও সুরক্ষার ভূমিকা, বঞ্চনা ও ট্র্যাজিক পরিণতির আর্তনাদ এই ছবির সকল শিল্পীদের অভিনয়ে ফুটে উঠেছে। দুর্গার বৃষ্টিভেজা লো-অ্যাঙ্গেল শট আবর্তিত হয়েছে নীতার মধ্যে। ভিনসেন্টের আঁকা শেষ জীবনের অন্যতম বিখ্যাত এবং রহস্যময় একটি মাস্টারপিস হলো “wheatfield with crows” – সোনালী গমের খেতের ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়া একঝাঁক কালো কাক ডানা ঝাপটে দিগন্তের দিকে চলে যাচ্ছে। অনেকে এই কাকগুলোকে আসন্ন মৃত্যু বা অমঙ্গলের বার্তা হিসেবে দেখেন, আবার কেউ মনে করেন এগুলো ছিল তাঁর জীবনের বন্দিদশা থেকে মুক্তির প্রতীক। ছবিতে দূর্গার বিসর্জন কি আত্মমুক্তি ! সে বিচার করবেন দর্শকরা। আমার মনে হোল – নীতা বোধহয় নিজের মৃত্যু দূর্গার মধ্যে প্রত্যক্ষ করল।
প্রতিকূল ও অন্ধকার পরিস্থিতিতেও মানুষের অদম্য সাহস এবং এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা যোগায় ‘অ২’। নন্দন -২ তে সগৌরবে ২য় সপ্তাহ চলছে। বন্ধুরা দেখে ফেলুন।
অভিনন্দন টিম #অ২ Chilka Roy Moumaa Sengupta Kalpita Karmakar #ashokroyactordirectorscreenplaywriter
