সুদীপা চৌধুরী : মেদিনীপুর, ২৫ অক্টোবর, ২০২৬। আমি লক্ষ্মীর বাহন। মানুষের ভাষায় আমার নাম পেঁচা। বছরের পর বছর কত লক্ষ্মীপুজো দেখেছি গাছের ডালে বসে। সন্ধ্যা নামলেই বাড়ির জানলায় আলো জ্বলে ওঠে। কোথাও উঠোনে, কোথাও বারান্দায়, কোথাও আবার বহুতলের দামি মার্বেলের মেঝেতে আঁকা হয় লক্ষ্মীর পায়ের ছাপ। ধান, দুর্বা, পদ্ম, নাড়ু, ফলমূল—আয়োজনের কোনও শেষ নেই। মানুষের বিশ্বাস, দেবী এলে সংসারে শ্রী আসবে, অভাব দূর হবে, সম্পদ বাড়বে। আমি চুপ করে দেখি।
গ্রামের মাটির বাড়ি থেকে শহরের আকাশছোঁয়া অট্টালিকা—আমার উড়ে বেড়ানোর পথে কত রকম সংসার চোখে পড়ে! কোথাও ভাঙা চালের তলায় একমুঠো চালের হিসেব মেলাতে গিয়ে রাত কেটে যায়, কোথাও আবার দামি ঝাড়বাতির আলোয় সাজানো খাবারের টেবিলে কত পদ যে অবহেলায় পড়ে থাকে, তার হিসেব কেউ রাখে না। কিন্তু অভাব কি শুধু খালি হাঁড়িতে থাকে? শহরের ঝকঝকে ফ্ল্যাটেও তো অভাব থাকে—কখনও সময়ের, কখনও ভালোবাসার, কখনও এমন একজন মানুষের, যার কাছে মুখোশ খুলে নিজের কষ্টটুকু বলা যায়।
যে বাড়ির দরজায় সবচেয়ে সুন্দর আলপনা আঁকা হয়, সেই বাড়িরই কোনও একটি ঘরে হয়তো দিনের পর দিন একা বসে থাকেন একজন মানুষ। পাশের ঘরে উৎসবের প্রস্তুতি চলে, মোবাইলের পর্দায় শুভেচ্ছার বন্যা বয়ে যায়, সামাজিক মাধ্যমে হাসিমুখের ছবি জমা হতে থাকে; অথচ একই ছাদের নীচে থাকা মানুষটির সঙ্গে দুটো মন খুলে কথা বলার সময় কারও হয় না। যে সংসারে দেবীর আগমনের জন্য এত অপেক্ষা, সেই সংসারেই কারও ফিরে আসার অপেক্ষাটা ক্রমশ পুরোনো হয়ে যায়।
আমি রাতের পাখি। আলো নিভে যাওয়ার পরেও আমার চোখ দেখতে পায়। তাই দেখি, পুজো শেষ হলে যত্ন করে গুছিয়ে রাখা হয় রুপোর বাসন, আলমারিতে তুলে রাখা হয় গয়না, পরের বছরের আয়োজনের জন্য হিসেব মেলানো হয়। অথচ উৎসবের দিনেও যে মানুষটি অপমান গিলে চুপ করে ছিলেন, তাঁর মুখের দিকে আর কেউ ফিরে তাকায় না। যে মানুষটি সারাদিন অন্যের সংসার সামলে নিজের ঘরে ফেরেন, তাঁর ক্লান্তির কোনও পুজো হয় না। যে কর্মীর পরিশ্রমে কারও বাড়ি আলোয় ঝলমল করে, সেই মানুষটির নিজের বাড়িতে হয়তো সেদিনও ঠিকমতো খাবার জোটে না। আলো থাকে, আয়োজন থাকে, দেবীর সামনে প্রার্থনাও থাকে—শুধু মানুষের দিকে তাকানোর চোখটাই কখনও কখনও থাকে না।
আবার অন্য দৃশ্যও দেখি। একটি ছোট্ট বাড়িতে পুজোর আয়োজন সামান্য। মাটির প্রদীপ, কয়েকটি বাতাসা, একমুঠো ধান। গৃহকর্ত্রী নিজের জন্য নতুন শাড়ি কেনেননি, সংসারের হিসেবও খুব স্বচ্ছল নয়। তবু দরজায় এসে দাঁড়ানো ক্ষুধার্ত মানুষটিকে ফিরিয়ে দেন না। নিজের বাড়িতে যে খাবারটুকু ভাগ করে খেতে হয়, তারই একাংশ তুলে দেন অন্যের হাতে। পাশের বাড়ির অসুস্থ মানুষটির জন্য খাবার পাঠান, কারও বিপদে নিজের সামান্য সঞ্চয় থেকে কিছুটা এগিয়ে দেন। তাঁর বাড়িতে সম্পদ কম, কিন্তু প্রাপ্তির হিসেবটা যেন অন্য রকম। আমি সেই বাড়ির কার্নিশেও বসেছি। সেখানে আমাকে তাড়িয়ে দেওয়ার জন্য কেউ লাঠি তোলে না।
মানুষ আমাকে নিয়ে কত কথা বলে! আমার ডাক নাকি অশুভ। অথচ দেবী লক্ষ্মীর পাশে আমিই বসে থাকি। কেউ আমাকে দেখলে জানলা বন্ধ করে দেয়, কেউ আবার আমার মূর্তি দেবীর পায়ের কাছে সাজিয়ে রাখে। একই পাখি কখনও ভয়ের, কখনও সৌভাগ্যের প্রতীক। আমি কারও বিশ্বাস ভাঙতে আসিনি। শুধু ভাবি, মানুষ কি কোনও কিছুকে না বুঝেই তার ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে ভালোবাসে? যে পাখিকে অমঙ্গলের প্রতীক বলে দূরে সরিয়ে দেয়, তারই মূর্তি আবার পরম যত্নে ঘরে প্রতিষ্ঠা করে। মানুষের এই দ্বৈত আচরণ আমাকে অবাক করে।
দেবীর পাশে আমার থাকার অর্থ কী, তার উত্তর আমার জানা নেই। আমি কোনও শাস্ত্র জানি না, কোনও তত্ত্বও বুঝি না। শুধু এতগুলো বছর মানুষের ঘর দেখতে দেখতে এটুকু বুঝেছি—ঐশ্বর্য আর সমৃদ্ধি এক নয়। সম্পদ জমিয়ে রাখা যায়, কিন্তু মনের উদারতা সিন্দুকে ভরে রাখা যায় না। বড় বাড়ি তৈরি করা যায়, কিন্তু সেই বাড়িতে আপন হয়ে ওঠা যায় কি না, তার কোনও নকশা নেই। অনেক মানুষের সঙ্গে এক ছাদের নীচে থাকা যায়, অথচ একজনের কাছেও নিজের নিঃসঙ্গতা পৌঁছে দেওয়া যায় না। আবার সামান্য আয়ের সংসারেও এমন একজন মানুষ থাকতে পারেন, যাঁর কাছে ফিরলে পৃথিবীটাকে আর এত নিষ্ঠুর বলে মনে হয় না।
আজও লক্ষ্মীপুজোর রাতে আমি কোনও এক গাছের ডালে, কোনও বহুতলের কার্নিশে কিংবা কোনও পুরোনো বাড়ির ভাঙা ছাদের ওপর বসে থাকব। নীচে আলো জ্বলবে, শঙ্খ বাজবে, দেবীর আরাধনা হবে। কেউ আমার ডাক শুনে জানলা বন্ধ করে দেবে, কেউ হয়তো ছবি তুলে সামাজিক মাধ্যমে লিখবে—লক্ষ্মীর বাহন দর্শন। আমি উড়ে যাব অন্য কোনও বাড়ির দিকে। দেখব, কোথাও একজন মানুষ অনেক সম্পদের মাঝেও নিজের শূন্যতা লুকিয়ে রেখেছেন, কোথাও আর একজন মানুষ সামান্য প্রাপ্তির মধ্যেও অন্যের জন্য একটু জায়গা বাঁচিয়ে রেখেছেন।
আমি তো রাতের পাখি। অন্ধকারে দেখাই আমার অভ্যাস। মানুষের ঘরে এত আলো জ্বলে, এত প্রদীপ জ্বলে, এত প্রার্থনা আকাশে ওঠে—তবু কোন অন্ধকারে যে মানুষের চোখ আটকে থাকে, আজও তা ভেবে পাই না।
লক্ষ্মীর বাহন হয়ে এত ঘর দেখলাম, এত প্রার্থনা শুনলাম—শুধু বুঝলাম না, মানুষ দেবীকে ঘরে আনার জন্য এত আয়োজন করে, অথচ মানুষকেই কখনও কখনও নিজের ঘরে জায়গা দিতে পারে না কেন।।
