প্রবীর রায় : প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা। কলকাতা, ২ মে, ২০২৬। মানিকদার সঙ্গে আমার পরিচয় “প্রতিদ্বন্দ্বী” র সময় ! যদিও ব্রাহ্ম হওয়ার সুবাদে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজে ওনাকে দু এক বার দেখেছি কিন্তু পরের দিকে উনি আর সমাজে যেতেন না ! ঠাকুরদা ঠাকুরমার কাছে গল্প শুনেছি “সুকুমার রায়” আমাদের তৎকালীন গড়পাড়ের বাড়িতে খুব আসতেন ! আমার ঠাকুরদা, ঠাকুরমা ওনাকে “তাতা” দা বলে ডাকতেন !
“প্রতিদ্বন্দ্বী”র সময় মানিকদা থাকতেন লেক টেম্পলে রোডে! “মেনকা” সিনেমার পাশে ! মানিকদা ওই ফ্ল্যাট ছেড়ে বিশপ লেফ্রয় রোডে চলে যাওয়ার পর সৌমিত্র চ্যাটার্জী ওই ফ্ল্যাটে আসেন ! জয়শ্রী সিলেক্ট হওয়ার পর আমরা প্রায়ই লেক টেম্পলে রোডের বাড়িতে যেতাম ! ফিল্মের কাজ ছাড়াও অনেকে আসতেন ! ধৃতিমান, কৃষ্ণা বসু , দেবরাজ রায় ছাড়াও সৌমিত্রদা , রবিদা , কামুদা (কামু মুখার্জী) প্রায়ই আসতেন এবং বেশ ভালো আড্ডা হতো ! মংকুদিও (বিজয়া রায় ) থাকতেন মাঝে মাঝে ! বাবু (সন্দীপ রায়) তখন বেশ ছোট , কিন্তু শুটের সময় , সবসময়ে থাকতেন ! তখন বংশী চন্দ্রগুপ্ত মানিকদার আর্ট ডিরেক্টর , অনিলদা (অনিল চৌধুরী ) আর ভানুদা তখন প্রোডাক্শনে ! সৌমেন্দু রায় তখন ক্যামেরাম্যান ! এখনকার বলিউডের বিখ্যাত চরিত্রাভিনেতা “তিনু আনন্দ” তখন মানিকদার থার্ড অ্যাসিস্ট্যান্ট ডিরেক্টর !
আমার তখন বয়েস খুবই কম , সেইজন্য সেই ভাবে অংশগ্রহণ করতে না পারলেও, খুব এনজয় করতাম ওনাদের সঙ্গ ! মানিকদার ওই কণ্ঠস্বর আর হাসি কখনো ভোলার না ! আর কেউ বাড়িতে এলে , মানিকদা নিজে গিয়ে দরজা খুলতেন ! ফোন এলেও নিজেই ধরতেন ! ৩ / ৪ জন সেক্রেটারি কোনোদিন দেখিনি ! মানিকদার বাড়ির আড্ডা মানে , সেটা অন্য লেভেলের ! চা বিস্কুটের আড্ডা ! উনি আমার ঠাকুরদাকে (ফিলিপস & রায়) খুব ভালো করে চিনতেন ! আমাকে জিজ্ঞাসাও করতেন , ঠাকুরদার কথা !
“প্রতিদ্বন্দ্বী” র শুট চলছে ইন্দ্রপুরী স্টুডিওতে ! সেদিন শেফালী, ভাস্কর চৌধুরী আর কল্যাণ চ্যাটার্জীর সিন ! শেফালী, ওই সিন শুটের সময় মংকুদি (বিজয়া রায়) ছাড়া আর কোনো মহিলাকে সেটে থাকতে দিতে রাজি না ! জয়শ্রীর খুব একটা বেরিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না ! আমার মনে আছে , মানিকদা জয়শ্রীকে বললেন “See the better part of life , you will get enough time to see the bad part ” ! আজ বুঝি কত বড় সত্যি কথা বলেছিলেন ! “প্রতিদ্বন্দ্বী” শুটের সময় কত অভিনেতা , অভিনেত্রীরা আসতেন শুধু মানিকদার শুট দেখতে !
“প্রতিদ্বন্দী” ছবির শুটিং হচ্ছে দীঘাতে। তখন দীঘাতে এতো হোটেল ছিলো না। দুটোই ছিল – ট্যুরিষ্ট লজ আর সৈকতাবাস। সৈকতাবাস মোটামুটি আর ট্যুরিস্ট লজটা বেশ ভালো। মানিকদা, সৌমেন্দুদা ( ডিরেক্টর অফ ফোটোগ্রাফি সৌমেন্দু রায়) জয়শ্রী, আমি, আমরা সবাই ট্যুরিস্ট লজে উঠেছি।
তখন মানিকদার ছবির শুটিং দেখতে অনেক বিদেশী সাহেব আসতেন। সে রকমই এক বিদেশী সাহেব ( নাম ভুলে গেছি), ম্যাঞ্চেস্টারে থাকেন, ভালো ভায়োলিন বাজান, মানিকদার সঙ্গে এসেছেন !
একদিন দুপুরে শুটিং নেই- আমরা কয়েকজন সাহেবের ঘরে বসে বিয়ার খাচ্ছি। লাঞ্চ টাইম। হঠাৎ দরজা ঠেলে মানিকদা ঢুকলেন। ওঁর সেই বিখ্যাত গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “Do you all want to have lunch or not?” মানিকদাকে দেখে সবাই বিয়ারের বোতল লুকোতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। পরমুহূর্তে মানিকদা “Ok, no problem, carry on..” বলে বেরিয়ে গেলেন। অগত্যা আমরাও লাঞ্চে গেলাম।
এমন কপাল, মানিকদা আর সেই সাহেবের সঙ্গে এক টেবিলে খাওয়ার স্থান হলো আমার, খেতে বসলাম। মানিকদা মিউজিক নিয়ে আলোচনা শুরু করলেন সাহেবের সাথে। আমার তখন কতোই বা বয়স। চুপ করে ওঁদের আলোচনা শুনছি। Different Musical Instrument , World Music, এই সব নিয়ে আলোচনা গড়াতে গড়াতে শেষ হলো মানিকদা বললেন, “ম্যাঞ্চেস্টারে অমুক দোকানে সব থেকে ভালো ভায়োলিন সারায়।”
এই হলেন সত্যজিৎ রায়। ম্যাঞ্চেস্টারের কোন দোকানে ভালো বেহালা সারানো হয়, সেটাও ওঁর নখদর্পণে।
এইখানে আর একটা ঘটনা না বলেই না ! আমার ভগ্নিপতি কিশোর চৌধুরী, ওয়াইল্ড লাইফ ফোটোগ্রাফি করতো ! সেই কারণে ও বিদেশে কোথা থেকে ওয়াইল্ড লাইফ ফটোগ্রাফির জন্য ২০০০০ ASA ফিল্ম নিয়ে এসেছিলো ! কিন্তু সেটার জন্য কত এক্সপোজার দেবে জানতো না ! আমি বললাম মানিকদাকে ফোন করো ! আমাকে দিয়ে ফোনটা করালো, আমি মানিকদাকে কিশোরের পরিচয় দিয়ে, কিশোরকে ফোন দিলাম ! মানিকদা সব শুনে বললেন , এটা আমি ঠিক বলতে পারছি না , তোমরা সুব্রতকে (সুব্রত মিত্র) ফোন করো ! উনিও বলতে পারলেন না ! আবার মানিকদাকে ফোন করা হলো, উনি তখন “ORWO ” কোম্পানির ইন্ডিয়ার হেড যিনি মুম্বাইতে বসেন, ওনার নম্বর দিয়ে ফোন করতে বললেন ! আরো বললেন , যদি উনি বলতে না পারেন, তাহলে ইন্ডিয়াতে কেউ বলতে পারবে না !
এই ঘটনাটা এখানে বলার উদেশ্য একটাই ! এটাই বোঝাবার জন্য যে সত্যজিৎ রায়ের মতো মানুষ , আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য , এতো খানি সময় দিলেন বা নষ্ট করলেন !
“Sometimes you worry with such a big
name but He was a down-to-earth man with no airs.”
আজকের দিনে এই মহান পরিচালক ও মানুষটিকে আমার সশ্রদ্ধ প্রণাম !
(০২.০৫.১৯২১ – ২৩.০৪.৯২)


